বহুল আলোচিত ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে নিজের প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে চীন সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক বিশেষ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং ঐতিহ্যগত বন্ধুরাষ্ট্র ভুটান থেকে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম কৌশলগত বিদেশ সফর হিসেবে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনকে বেছে নিতে যাচ্ছেন। এই হাই-প্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় সফরের মূল আকর্ষণ হতে চলেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিলিয়ন ডলারের মেগা চুক্তিটি। ঢাকার নতুন নির্বাচিত সরকার দেশের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসন ও কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে পানি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এই প্রকল্পে বিশাল অঙ্কের অর্থায়নের জন্য বেইজিংয়ের এক্সিম ব্যাংকের (EXIM Bank) সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সম্ভাব্য মেগা সফরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্যই দুই দেশের জন্য একটি সুবিধাজনক ও ফলপ্রসূ সময়ে চীন সফর করবেন; তবে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে এর সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ও সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত বা দাপ্তরিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের অত্যন্ত প্রভাবশালী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এই সফরকে ‘আসন্ন’ ও ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নতুন প্রধান নির্বাহীর এই বেইজিং সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং চীন বরাবরের মতোই বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সব ধরনের বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব অব্যাহত রাখবে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা পরবর্তী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ক্ষমতার এই বড় রদবদলের পর নতুন সরকারের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতিতে (Geopolitics) একটি বিশাল কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) এলাকার খুব কাছাকাছি অবস্থিত এই তিস্তা প্রকল্পে চীনের প্রত্যক্ষ আর্থিক ও কারিগরি সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই নয়াদিল্লির গভীর নিরাপত্তা ও সামরিক উদ্বেগ রয়েছে। যদিও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগের মাসগুলোতে ভারতের মোদি সরকার নিজেই এই প্রকল্পে অর্থায়নের একটি আনুষ্ঠানিক কাউন্টার প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে দিল্লির সেই প্রস্তাবটি বর্তমানে সচল বা বিবেচনাধীন আছে কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ভারতের সিকিম রাজ্য থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হওয়া তিস্তা নদীর দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা পানি বণ্টন চুক্তিটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির একরোখা রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে গত ১৫ বছর ধরে হিমাগারে ছিল। তবে, সম্প্রতি ভারতের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্য সরকার গঠন করায় এই তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক অগ্রগতির একটি জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন কিছু কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক। এমতাবস্থায়, দক্ষিণ এশিয়ার দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত ও চীনের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থ এবং ভূরাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের মুখে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কীভাবে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আদায় করেন, এখন সেটিই দেখার বড় বিষয়।



















