সৌদি আরবে বাংলাদেশী শ্রমিকদের নাজুক অবস্থা: ‘ফ্রি ভিসার’ ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজারো কর্মী
লাখ টাকা খরচ করেও মিলছে না কাজ, অল্প বেতন ও ভোগান্তিতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ বর্তমানে নাজুক পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। তথাকথিত ‘ফ্রি ভিসার’ নামে চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে দেশটিতে যাওয়ার পর পদে পদে শুধু ভোগান্তি আর অল্প বেতন জুটছে তাদের কপালে। এই পরিস্থিতিতে মানিয়ে চলতে না পারায় অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন দেশে ফিরতে।
সৌদি আরবের জেদ্দায় একজন প্রবাসী শ্রমিক নিজের নাম প্রকাশ না করে সম্প্রতি একজন বাংলাদেশী সাংবাদিককে জানান তার প্রতারিত হওয়ার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে ‘ফ্রি ভিসায়’ আসার পর দালাল তাকে তিন মাসের ‘আকামা’ ধরিয়ে দেয় এবং তারপর কোনো খোঁজ রাখেনি। তিন মাস বেকার থাকার পর ২০০ রিয়াল খরচ করে অন্য এক দালালের মাধ্যমে কাজ পেলেও তার বেতন মাত্র ৬০০ রিয়াল, যা মালিক দেন তিন মাস পর পর। থাকা-খাওয়া সবকিছু নিজের।
ওই হতভাগ্য শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, “এখানে তো নিজেই চলতে পারছি না। সংসার চালাতে ২০-২৫ হাজার টাকা কিভাবে পাঠামু। কোনোমতে চলি।” তিনি বিদেশে আসতে ইচ্ছুক অন্য শ্রমিকদের সতর্ক করে বলেন, “এখানে আপন ভাই আপন বন্ধু কেউ নাই। আমাকে আপন বন্ধু এখানে আইন্নে বিপদে ফালাইয়্যা দিছে। এই মুহূর্তে এখানে না আসাই ভালো।”
দালাল চক্রের তৎপরতা ও বিএমইটির কঠোরতা
প্রবাসীদের এমন নাজুক অবস্থার পরও দেশের বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা তাদের দালালদের মাধ্যমে কর্মীদের নানা কৌশলে ফাঁদে ফেলে পাসপোর্ট ও নগদ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে কর্মীদের বিমানে তুলে দেওয়ার পর থেকেই তাদের দুর্ভোগ শুরু হয়।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সৌদিগামী কর্মীদের বিপদে পড়ার খবর পাওয়ার পর ডিজি ও এডিজিদের নির্দেশে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, ভিসা, কাজ ও দূতাবাসের সত্যায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরই বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যু করা হচ্ছে। এই কঠোরতার কারণে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রতারিত হওয়ার সংখ্যাও কমছে।
তবে ব্যবসায়ীদের সুবিধাবাদী কিছু সদস্য বিএমইটির ওপর চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, এসব এজেন্সির সঙ্গে বিএমইটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ থাকার কারণেই সৌদি আরবের শ্রমবাজার এখনো অশান্ত হয়ে আছে।
অন্যদিকে, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক দাবি করেছেন, যারা তিন মাসের ভিসা নিয়ে যাচ্ছেন তারাই মূলত বিপদে পড়ছেন। যারা ভালো কোম্পানিতে যাচ্ছেন, তারা যথাসময়ে বেতন-সুবিধা পাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই সৌদি আরবে পাড়ি জমান। বিএমইটিতে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শ্রমিক ও তাদের স্বজনরা প্রতারিত হওয়ার লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন, যার তদন্তে সমস্যাগুলোর সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে।


















