পাঁচ করবর্ষে ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে করা আবেদন সাড়া পায়নি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের করা আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন। আদালত বলেছেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় না দেখে ওই রায়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়করের বৈধতা নিয়ে করা রুল খারিজ করে রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
হাইকোর্টের ওই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম মহিউদ্দিন চৌধুরী আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। সোমবার আবেদনটির শুনানি হয়।
আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ আজাদ।
শুনানি শেষে আইনজীবী আবদুল্লাহ-আল-মামুন সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে লিভ টু আপিল করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত রায় বাস্তবায়নের কোনো কার্যক্রম যাতে নেওয়া না হয়, সে জন্য স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়েছিল। তবে চেম্বার আদালত লিখিত রায় প্রকাশ না হওয়ায় এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ আজাদ জানান, গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষ থেকে চেম্বার আদালতে একটি সিএমপি (বিবিধ আবেদন) করা হয়েছিল। আদালত আবেদনটি ডিলিট করে দিয়েছেন।
কীভাবে শুরু হয় আয়কর বিরোধ
২০১৭ সালের ৭ ও ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার ১৪ নম্বর কর অঞ্চল থেকে দুটি পৃথক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। এতে পাঁচ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে মোট ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর দাবি করা হয়।
কর অফিস গ্রামীণ কল্যাণকে দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর শুনানিতে হাজির হতে বলে। ওই দিন প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের জন্য এক মাস সময় চাওয়া হলেও কর অফিস তা নাকচ করে ২৬ সেপ্টেম্বর আদেশ দেয়। পরে ওই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলে ১৪ নভেম্বর সেটিও খারিজ করা হয়।
এরপর কর অফিসের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে দুটি রিট করে। শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর আদালত রুল জারি করেন এবং সংশ্লিষ্ট আদেশগুলো কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চান।
রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আয়কর দাবির নোটিশের কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরে কয়েক দফায় এ স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
মামলার পরবর্তী ধাপ
২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২০১৭ সালে জারি করা রুল পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে রায় দেন। ওই রায়ে ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর ১৪ কর অঞ্চলের দেওয়া আদেশ বাতিল করা হয়।
এর বিরুদ্ধে এনবিআর ২০২৩ সালে পৃথক লিভ টু আপিল করে। আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১১ মার্চ লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে হাইকোর্টে মূল বিষয়বস্তুর ওপর শুনানির নির্দেশ দেন।
শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট রিট খারিজ করে রায় দেন। পরে ৪ অক্টোবর ওই রায় প্রত্যাহার করা হয়। মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে তিনি রুল শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন।
নতুন বেঞ্চ গত ১০ সেপ্টেম্বর রুল খারিজ করে রায় দেন। এর ফলে পাঁচ করবর্ষের ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর সংক্রান্ত দাবি বহাল থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়েই চেম্বার আদালতে আবেদন করেছিল গ্রামীণ কল্যাণ, যা সোমবার কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো।


















