ইরানের সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বহুলালোচিত ও দীর্ঘায়িত রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের মাঝেই দেশটির ভেতরে নতুন করে ব্যাপক ও বিধ্বংসী সামরিক বিমান হামলা শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালির কৌশলগত জলপথে তিনটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জ্বালানি ট্যাংকারে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চরম প্রতিশোধ হিসেবে ওয়াশিংটন এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আজ বুধবার (৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর লাইভ আপডেট অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক বিমান হামলায় ইতোমধ্যে ইরানের অন্তত ৮০টি কৌশলগত ও সামরিক অঞ্চল কেঁপে উঠেছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির অতি গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ ও খার্গ দ্বীপে দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সিরিক ও কেশম দ্বীপে মধ্যরাতের বোমাবর্ষণ এবং বেসামরিক জেটি ধ্বংস
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি (Press TV) এবং স্থানীয় একাধিক তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে প্রথম দফার হামলাটি চালানো হয় ইরানের উপকূলীয় শহর সিরিক এবং সংলগ্ন কেশম দ্বীপে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাতে সিরিকের প্রধান মাছ ধরা ও বাণিজ্যিক জেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানি সংবাদ সংস্থা আইআরআইবি (IRIB) জানিয়েছে, এই অতর্কিত হামলায় সিরিক বন্দরে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মী ও বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদেরকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় মিনাব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সিরিক ও কেশম দ্বীপে প্রথম দফার বোমাবর্ষণের ঠিক পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ঘোষণা করে যে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে বড় ধরনের এই বিমান হামলা শুরু করেছে।
খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কঠোর হুঁশিয়ারি
কেশম দ্বীপের পর মার্কিন বিমান বাহিনীর মূল টার্গেটে পরিণত হয় হরমুজ প্রণালির অন্যতম প্রধান ইরানি তেল টার্মিনাল ও কৌশলগত ঘাঁটি ‘খার্গ দ্বীপ’ (Kharg Island)। সেখানে একের পর এক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় পুরো দ্বীপজুড়ে তীব্র আগুনের লেলিহান শিখা ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড তাদের বিবৃতিতে পরিষ্কার জানিয়েছে:
- জাহাজে হামলার নিখুঁত জবাব: মঙ্গলবার দিনের বেলা ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করা কাতারভিত্তিক একটি এলএনজি (LNG) ট্যাংকারসহ মোট তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে চালানো বিপজ্জনক হামলার সরাসরি জবাবেই এই আক্রমণ।
- যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের এই আগ্রাসনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির (Ceasefire) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে পেন্টাগন।
- সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধনের লক্ষ্য: সেন্ট্রাল কমান্ড আরও সতর্ক করেছে যে, এই নিখুঁত ও ধারাবাহিক বিমান হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটানোর শাস্তি হিসেবে ইরানের সামরিক অবকাঠামোগুলোর ‘সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন’ করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে আর কোনো জাহাজে হামলার সাহস না পায়।
ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় জানাজার প্রস্তুতি এবং চলমান উত্তেজনা
ভূরাজনৈতিক এই চরম ও মারাত্মক উত্তেজনার মাঝেই আজ বুধবার প্রতিবেশী দেশ ইরাকের পবিত্র শিয়া নগরী নাজাফ এবং কারবালায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। ইরাকের লাখো শিয়া মুসলমানের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও অনুকরণীয় ধর্মীয় নেতা হওয়ায়, ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার কফিন পৌঁছানোর পর সেখানে এক বিশাল ঐতিহাসিক জানাজা ও শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে ইরাক সরকার আজ বুধবার দেশজুড়ে সাধারণ ও সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে একদিকে যখন ইরাকে লাখো মানুষের সমাগমে খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে তখন ইরানের মূল ভূখণ্ড ও হরমুজ প্রণালির সামরিক ঘাঁটিগুলোতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের অনবরত গর্জন দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সমঝোতাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যে এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা


















