প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকগুলোতে ইস্যুটি আলোচনায় আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে. ভারতের কৌশলগত আপত্তি, চীনের দীর্ঘদিনের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার কারণে তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে এখন ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশ তৈরি হয়েছে. ভারতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এবং দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ‘সবার নজর এখন তিস্তায়’—এমন কৌতূহল দেখা দিয়েছে. চারদিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে তিস্তা ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, মুক্তবাণিজ্য, জ্বালানি ও উন্নয়ন সহযোগিতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে.
ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা ‘কনসার্ন’ ও চিকেন নেক
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা সংবেদনশীল ‘চিকেন নেক’-এর কাছাকাছি হওয়ায়, সেখানে চীনের যেকোনো ধরনের ভৌত অবকাঠামোগত বা প্রযুক্তিগত উপস্থিতি ভারত তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে. চীন-বাংলাদেশ বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম জানান, চীন অনেক আগেই নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তার নাব্য ও কারিগরি বিষয়ে বড় সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে এবং তারা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অত্যন্ত আগ্রহী. কিন্তু ভারতের তীব্র আপত্তির কারণে বিগত এক দশকে উদ্যোগটিতে ভাটা পড়ে. অন্যদিকে, নদীটি ভারত থেকে প্রবাহিত হলেও দীর্ঘ এক দশকে নরেন্দ্র মোদি সরকারের একাধিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতায় ২০১১ সালের চূড়ান্ত হওয়া খসড়া চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা মেলেনি. ফলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা মরুভূমি হয়ে যায় এবং বর্ষায় ভারতের ছাড়া অতিরিক্ত পানিতে দুই কূল বন্যায় ভেসে যায়.
প্রকল্পের ঋণঝুঁকি ও নিজস্ব অর্থায়নের দাবি
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চার দফা যৌক্তিক প্রশ্ন ও সতর্কবার্তা তুলে ধরেছেন: ১. কারিগরি উপযোগিতা: নদীশাসন বিশেষজ্ঞরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে এই কৃত্রিম অববাহিকা প্রকল্প বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে. ২. ঋণের বোঝা: প্রকল্পটির জন্য বিদেশি অর্থায়ন নেওয়া হলে তা বড় ঋণ হিসেবে আসবে, যা দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ বা ঋণঝুঁকি তৈরি করতে পারে. ৩. পরিবেশগত প্রভাব: পানির প্রাকৃতিক প্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টির পরিবেশগত প্রভাব বিশদভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন. ৪. বহুপাক্ষিক সমাধান: যেহেতু তিস্তার উজানের অংশ আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে, তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং ভারত ও চীনকে যুক্ত করে বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করাই হবে টেকসই সমাধান.
এমন পরিস্থিতিতে নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদসহ দেশের একদল অর্থনীতিবিদ দাবি তুলেছেন যে, যেহেতু ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তাই তিস্তা প্রকল্প সম্পূর্ণ বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা উচিত. সরকারও সম্প্রতি নিজস্ব অর্থায়নে এটি করার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে.
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান অবস্থান
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দেশের রাজনীতিতে প্রায় এক দশক ধরে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি এসেছে. বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’র সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল এবং ২০১৮ সালে তারা ৮ হাজার কোটি টাকার একটি উচ্চ সুদের প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব দেয়, যা কারিগরি কমিটি নাকচ করেছিল. সরকার পরিবর্তনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেছিলেন. পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান যে বেইজিং এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ প্রস্তুত.
সম্প্রতি কাউনিয়া পয়েন্টে বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ঘোষণা করেছেন যে, ১৯৭৮-৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিস্তায় যে প্রথম ব্যারেজের উদ্যোগ ও মহাপরিকল্পনার চিন্তা করেছিলেন, তা এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাস্তবায়িত হবে. বর্তমানে নদী ড্রেজিং ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি প্রকল্পের বাস্তবায়নযোগ্যতা পর্যালোচনা করছে.


















