যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতাকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র মতবিরোধ ও উত্তাপ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আপসের ঘোর বিরোধিতা করে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
সর্বোচ্চ নেতার শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন ও পেজেশকিয়ানের ওপর চাপ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই চুক্তি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর ছেড়ে দিলেও বিষয়টি নিয়ে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা না গেলেও সম্প্রতি প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় তিনি জানান যে নীতিগতভাবে তাঁর অবস্থান ভিন্ন ছিল। তবুও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সুপারিশের ভিত্তিতেই তিনি এই সমঝোতা অনুমোদন করেছেন। তবে খামেনির একটি বিশেষ শর্ত ছিল—নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যকে এই চুক্তির পক্ষে থাকতে হবে এবং পরিষদের অধিকাংশ সদস্যই শেষ পর্যন্ত এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন।
এই অনুমোদনের পরও কট্টরপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই সমঝোতা ভবিষ্যতে ইরানের জন্য নতুন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অবশ্য প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে শান্তি ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন এক জাতির বার্তা, যারা নিজেদের স্বাধীনতা ও মর্যাদার সঙ্গে কোনো আপস করতে রাজি নয়।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অবস্থান
পাকিস্তান ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করছে; তাদের মতে, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমাতে আরও অনেক বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
এদিকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ বা পূর্ণ আস্থা রেখে নয়, বরং অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেই তারা এই আলোচনায় অংশ নেবে। একই সঙ্গে চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে প্রয়োজনীয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রস্তুতিও তারা রেখে দিয়েছে।
কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ ও পার্লামেন্টের সক্রিয়তার দাবি
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই চুক্তিকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন যে, যুদ্ধকালীন অর্জনগুলোকে আলোচনার টেবিলে তুলে আনা সম্ভব হয়েছে, তবে সামনে এখনও দীর্ঘ পথ বাকি। একই সঙ্গে তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে এবং এই ইস্যুতে কোনো সমঝোতা না হলে আলোচনার টেবিল ছেড়ে আসার দাবি জানাচ্ছে।
দেশটির বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, স্পিকার গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে। কট্টরপন্থীদের মূল অভিযোগ হলো, এসব নেতা আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিতে পারেন। মাশহাদে জুমার খুতবায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আহমদ আলামোলহোদা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের অবসান হয়নি এবং আদর্শিক লড়াই এখনও চলমান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন সংসদ সদস্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সীমিত কার্যক্রমে থাকা পার্লামেন্টকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানিয়েছেন, যাতে জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি হলে তা সংসদীয় ভূমিকার মাধ্যমে ঠেকানো যায়।
সংবাদমাধ্যমের বিভক্ত অবস্থান
চুক্তিটিকে ঘিরে ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যেও সুস্পষ্ট বিভক্তি ও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে:
- রক্ষণশীল পত্রিকা: এই ধারার পত্রিকাগুলো বলছে যে, সর্বোচ্চ নেতা কেবল শর্তসাপেক্ষেই এর অনুমোদন দিয়েছেন এবং সামনে অত্যন্ত কঠিন পথ অপেক্ষা করছে।
- সংস্কারপন্থী সংবাদমাধ্যম: অন্যপক্ষে, সংস্কারপন্থী মিডিয়াগুলো এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ইরানের একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়ে ইরানের সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও গভীর মতপার্থক্য বিদ্যমান। এই চুক্তির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ ফলাফলই মূলত নির্ধারণ করবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়।



















