সৌদি আরবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশ থেকে দেশটিগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এতে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং দেশে আটকে পড়েছেন ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। ফ্লাইট বিপর্যয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রবাসী কর্মীরা। তাঁদের অনেকেরই সৌদি আরবে প্রবেশের সময়সীমা শেষের দিকে থাকায় চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। এরই মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে এখন পর্যন্ত ১২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সাউদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালাম এয়ারের তিনটি, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, এমিরেটসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি এবং ফ্লাই দুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বেবিচক জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় এসেছে। রিয়াদগামী ফ্লাইটগুলো অন্য পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা বাতিল করা হচ্ছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চাকরি ও ভিসার মেয়াদ নিয়ে দুশ্চিন্তা
গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অনেক প্রবাসী জানেন না, কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কী।
ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাঁদের অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার খরচের চাপও তৈরি হয়েছে।
সৌদিপ্রবাসী রফিকুল ইসলামের ছুটি কাটিয়ে গতকাল দুপুরে রিয়াদে ফেরার কথা ছিল। টিকিট কেটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। আমাকে যেকোনো মূল্যে সৌদি আরব যেতে হবে। সময়মতো যেতে না পারলে চাকরি বাঁচানো যাবে না। সবকিছু অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে। পরবর্তী ফ্লাইটের সিদ্ধান্ত জানানো হলে ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।’
রফিকুলের মতো অনেক প্রবাসীই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে চাকরি, ভিসার মেয়াদ ও নিয়োগকর্তার শর্ত নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা করছেন।
বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর উদ্যোগ
জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প ফ্লাইটে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এয়ার অপারেটরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থায় যাত্রীদের দাম্মাম ও মদিনা বিমানবন্দরে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধের ঘটনা শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেই ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছে। যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে। যাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প ফ্লাইটে ওই দুই বিমানবন্দরে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা সেখান থেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন।
তিনি বলেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করায় যাত্রীদের পাঠানোর ক্ষেত্রে সমন্বয় করা হচ্ছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।
দূতাবাসের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও আইনি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি-সম্পর্কিত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ, আদান-প্রদান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ছবি, ভিডিও বা স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ কিংবা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের হটলাইন নম্বরগুলো হলো—শ্রমসংক্রান্ত বিষয়ে ৮০০১০০০১২৫, পাসপোর্টসংক্রান্ত বিষয়ে ৮০০১০০০১২৬, ডিপ্লোম্যাটিক উইংয়ের জন্য ৮০০১০০০১২৪ এবং মৃত্যুসংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজনে +৯৬৬৫৭০২১২১৮০।
সৌদি আরবে আটকে পড়াদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
সৌদি আরবে বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দরে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি আটকে পড়েন।
তাঁদের মধ্যে ১৭ জনকে ম্যারিয়ট হোটেল, ২৫ জনকে রেডিসন ব্লু এবং ৪০ জনকে রিয়াদের প্রিন্সেস নুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সৌদিয়া এয়ারলাইনসের বাতিল হওয়া এসভি৮০৪ ফ্লাইটের প্রায় ৪০০ যাত্রীকে সৌদি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলা তিনজন বাংলাদেশির জন্য জরুরি ট্রাভেল পারমিটও ইস্যু করেছে দূতাবাস।
হামলায় আহত ২৭ বাংলাদেশি
দূতাবাসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শনিবারের হামলায় আহত বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১১ জন সৌদিপ্রবাসী কর্মী এবং ১৬ জন ওমরাহযাত্রী।
আহতদের মধ্যে ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন বাকি ১৫ জনের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদ ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন নওগাঁর সাফফাত রহমানের ডান পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে।
ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সৌদি আরবগামী ও সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


















