রাজধানী ঢাকার অন্তত ৪২টি এলাকায় প্রকাশ্যেই চলছে মাদক কেনাবেচা। এসব কারবারে কিশোরদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো এলাকায় মাদক ব্যবসার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জানা থাকলেও কার্যকর অভিযান নিয়মিত হচ্ছে না। ফলে ছোট বিক্রেতা ও সেবনকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, যা বিহারি ক্যাম্প নামেও পরিচিত, সেখানে ক্যাম্পার বাজার এলাকায় ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রায় ২৫ হাজার উর্দুভাষী মানুষের বসবাসের এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প, ভাসানটেক পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং সবুজবাগের বাগপাড়া এলাকায়।
সরেজমিনে এসব এলাকায় গেলে ছোট ছোট দলে থাকা কিশোরদের পথচারীদের কাছে গিয়ে মাদক বিক্রির প্রস্তাব দিতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রেতা সন্দেহ হলে তারা ইয়াবাকে ‘পিংক ট্যাবলেট’ বা ‘গুটি’ নামে উল্লেখ করে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, এমনকি সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও মাদক কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত স্থানগুলোতে যাতায়াত করেন। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘ভূতুড়ে মার্কেটে’ মাদকের আড্ডা
মিরপুরের প্যারিস রোডে প্রায় ২৮ বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি বড় কংক্রিটের স্থাপনা স্থানীয়দের কাছে ‘ভূতুড়ে মার্কেট’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ভবনটিতে দিনদুপুরেও মাদকের আড্ডা বসে। ভবনটির পশ্চিম পাশে রয়েছে এ ব্লক কমিউনিটি পুলিশের কার্যালয়।
স্থাপনাটির ভেতরে যাতায়াতের জন্য কয়েকটি সরু ও ঘিঞ্জি পথ রয়েছে। ভবনের নিচতলায় রিকশা ও ভ্যান সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবন ও আশপাশে ফেনসিডিলের বোতল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাদক-সংশ্লিষ্ট বিরোধের জেরে গত পাঁচ বছরে ওই ভবন থেকে আটটির বেশি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। ভবনের পশ্চিম পাশের কিছু অংশ দখল করে বস্তিও গড়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পল্লবীর ৩৯টি বিহারি ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর জাহান জানান, ক্যাম্পগুলোর অলিগলিতে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হয়। তাঁর ভাষ্য, ব্লক রেইড ছাড়া এসব স্থানে অভিযান চালানো কঠিন ছিল। দায়িত্বে থাকাকালে তিনি তিন থেকে চার হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছিলেন বলে দাবি করেন।
এদিকে বাউনিয়াবাঁধ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানের এক কোণে দুই তরুণকে ছোট ছোট প্যাকেটে গাঁজা বিক্রি করতে দেখা গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়াবা ও অ্যামফিটামিনজাতীয় মাদক জব্দ বেড়েছে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইয়াবাসহ অ্যামফিটামিন-জাতীয় উদ্দীপক (এটিএস) ট্যাবলেট জব্দ করেছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১টি। ২০২৪ সালে জব্দের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১টি। সে হিসাবে এক বছরে জব্দের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে জব্দ হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯টি।
এটিএসের মধ্যে মেথঅ্যামফিটামিনভিত্তিক ইয়াবার মতো সিনথেটিক উদ্দীপক মাদক রয়েছে। ডিএনসি সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দিন বলেন, ইয়াবার সরবরাহ ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় জব্দের পরিমাণ বেড়েছে। রাজধানীর যেসব স্থানে অবাধে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে, সেসব এলাকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কারণে মাদকবিরোধী উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। তাঁর মতে, মাদক পাচার থেকে শুরু করে বিক্রি ও সেবন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব চক্রের রুট, বাহক ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য জানার পরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে না পারলে তা গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদক উৎপাদনকারী প্রধান অঞ্চলগুলোর কাছাকাছি অবস্থান এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় বাংলাদেশ মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ প্রধানত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। তবে পাচারকারীরা উপকূলীয় এলাকা, নদীপথসহ বিভিন্ন বিকল্প রুটও ব্যবহার করে।
বিভিন্ন কৌশলে ঢাকায় ইয়াবা সরবরাহের অভিযোগ
প্রতিবেদনে টেকনাফের বশির ও ঢাকার কেরানীগঞ্জের আবুল হোসেনের নাম উল্লেখ করে রাজধানীতে ইয়াবা সরবরাহের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবুল হোসেনের সাবেক দ্বিতীয় স্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারকেলের ভেতরে ইয়াবা লুকিয়ে ঢাকায় আনার কৌশল ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দাবি, কক্সবাজারে পর্যটক হিসেবে যাতায়াতের সময় শরীর ও ব্যাগে করেও ইয়াবা আনা হতো।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে কদমতলীর মিরাজনগর এলাকা থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ আবুল হোসেনকে আটক করেছিল র্যাব-১০। এ সময় তাঁর সঙ্গে আরও দুই সহযোগী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা রিকশা ও ভ্যানচালকের আড়ালে ইয়াবা সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১ আগস্ট ভাসানটেক সরকারি কলেজের পেছনে ভাসানটেক পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটি অসম্পূর্ণ ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সময় এক তরুণ প্রতিবেদকের কাছে ইয়াবা বিক্রির প্রস্তাব দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি বড় আকারের ইয়াবার দাম চাওয়া হয়েছিল ৪০০ টাকা।
এ ছাড়া হাতিরঝিলসংলগ্ন দক্ষিণ বেগুনবাড়ীর এফডিসি গেট এলাকা, মিরপুর-১-এর গোড়ারঘাট এবং মিরপুর-১২-এর সিরামিক গেট এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা সরবরাহ বেড়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (গোয়েন্দা) মেহেদী হাসান জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ বেড়েছে। এক বছর আগেও মাসে ১০ থেকে ২০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ হতো, এখন তা বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার পিসে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযান বাড়ানোয় বেশি চালান শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চোরাচালান হওয়া মাদকের মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ জব্দ করা সম্ভব হয় বলে তাঁদের ধারণা। বাকি অংশের বড় একটি ভাগ বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, মাদক পাচার বাড়লে জব্দের পরিমাণও সাধারণত বাড়ে।
মাদক ব্যবসায় অপরাধী চক্রের বিস্তার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে প্রায় ৫০০ ব্যক্তি সরাসরি মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে সূত্রের দাবি। মূল হোতারা ক্যাম্পের বাইরে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সবুজবাগের বাগপাড়ায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে আলী ও ওলি নামের দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। গত ২১ জুলাই সবুজবাগে ইব্রাহিম পলাশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ আলীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর ভাই ওলিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-৮-এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক পুলিশ সুপার রিয়াজউদ্দিন আহমেদ জানান, তাঁরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সতর্ক অবস্থানে থেকে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পে অনলাইন জুয়া, অপহরণ ও ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা মোকাবিলায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি
ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক সাময়িক উত্তেজনা বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। এসব মাদকের অপব্যবহারে উদ্বেগ, আগ্রাসী আচরণ, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, যকৃৎ ও মস্তিষ্কের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনে মৃত্যুও হতে পারে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ, জব্দের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং সংগঠিত চক্রের সক্রিয়তা মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযান জোরদার ও অপরাধীদের শনাক্ত করার কথা বললেও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং মাদকের সরবরাহ কমানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদক ব্যবসার অর্থে কারবারিরা কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা নিয়ে প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে বিস্তারিত তুলে ধরার কথা জানানো হয়েছে।


















