নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর কয়েক মাস বাকি থাকলেও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপার কাজ এখনো শুরু করেনি বেশির ভাগ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। মাধ্যমিক স্তরের বই সরবরাহের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ স্তরের মাত্র ২০ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বই ছাপার অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার সক্ষমতা বিবেচনায় ২৬টি প্রেসকে নজরদারিতে রেখেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রেসের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারও নেওয়া হচ্ছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। ১১৩টি প্রেসে চলছে এসব বই মুদ্রণের কাজ। এতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। কোনো কোনো প্রেসের ক্ষেত্রে নভেম্বর তো দূরের কথা, ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দু-চারজন দুষ্ট সব জায়গায়ই থাকে। আমাদের এখানেও আছে। তবে সরকারের একাধিক সংস্থাসহ আমরা সেইসব প্রেস খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের টিম নিয়মিত তদারকির কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক স্তরের বইয়ের কাজ আগে শেষ করার তাগিদ দেওয়ায় মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। প্রাথমিকের কাজ শেষ হলে মাধ্যমিকের বই ছাপার গতি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বই ছাপার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলেও প্রত্যাশা তাঁর।
প্রাথমিকের বই সরবরাহে এগিয়ে প্রথম শ্রেণি
ইন্সপেকশন এজেন্টগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। শ্রেণিভিত্তিক হিসাবে প্রাক-প্রাথমিকের ৮৬ দশমিক ২১ শতাংশ, প্রথম শ্রেণির ৭৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণির ৭৫ দশমিক ৬২ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৬৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৩৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। ইবতেদায়ি স্তরের বই সরবরাহের হার ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরে ষষ্ঠ শ্রেণির ৪৪ দশমিক ০৩ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণির ২৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির মাত্র ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহ এখনো শুরু হয়নি।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ একই প্রেসে করা হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। ফলে যে স্তরের বই আগে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো সেদিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের কার্যাদেশ তুলনামূলকভাবে পরে হওয়ায় অধিকাংশ প্রেস এখনো ছাপার কাজ শুরু করতে পারেনি।
প্রাথমিকের বই সরবরাহের সময়সীমা ৯ নভেম্বর
এনসিটিবির শর্ত অনুযায়ী, চুক্তির তারিখ থেকে পাঠ্যবই ছাপা ও সরবরাহের জন্য প্রতিটি প্রেস ৭০ দিন সময় পায়। প্রাথমিক স্তরের ৫০ শতাংশ বই ৯ অক্টোবরের মধ্যে এবং শতভাগ বই ৯ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহের চুক্তি রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের সময়সীমা ৩ নভেম্বর এবং শতভাগ বই সরবরাহের শেষ সময় ৩ ডিসেম্বর।
তবে বেশি কাজ পাওয়া কয়েকটি প্রেস নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির পরিদর্শক দল নিয়মিত প্রেসগুলো পরিদর্শন করছে। তারা বইয়ের মান যাচাইয়ের পাশাপাশি মুদ্রণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কেও প্রতিবেদন দিচ্ছে।
নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার আশঙ্কা
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, আগের মতো ফেব্রুয়ারি-মার্চে নয়, বরং ডিসেম্বরের মধ্যেই মানসম্মত বই স্কুলগুলোতে পৌঁছানো উচিত। তাঁর অভিযোগ, কিছু মুদ্রণকারী ইচ্ছাকৃতভাবে ছাপার কাজে দেরি করছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি কাজ পেয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শেষ সময়ে বই সরবরাহের চাপ তৈরি হলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবিকে আগেই সতর্ক থাকতে হবে।
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া শিক্ষা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। এ লক্ষ্য পূরণে মুদ্রণকাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি বইয়ের মান নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলা এখন এনসিটিবির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।


















