চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী বন্যায় জেলার মৎস্য সম্পদে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। টানা অতিভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে জেলার হাজার হাজার পুকুর, দিঘি ও মাছের বাণিজ্যিক ঘের। খামারের উৎপাদিত সব মাছ পানিতে ভেসে যাওয়ায় মৎস্যচাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ, অনেকেরই আক্ষরিক অর্থে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। জেলা মৎস্য অফিসের সর্বশেষ প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বন্যায় চট্টগ্রামে শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতি হয়েছে শতকোটি টাকারও বেশি এবং সরাসরি আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক মাছচাষি।
জেলা মৎস্য অফিসের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, চলমান বন্যায় শনিবার (১১ জুলাই, ২০২৬) পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলার মোট ১৫৩টি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে মৎস্য খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। ঢলের পানিতে জেলার মোট ১২ হাজার ২৫ি১টি পুকুর, দিঘি ও মাছের খামার সম্পূর্ণ ভেসে গেছে, যার সম্মিলিত আয়তন প্রায় ৪ হাজার ১০৬ হেক্টর। পুকুর ও দিঘির পাশাপাশি জেলার আরও ৩২০টি বড় মাছের বাণিজ্যিক ঘের পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এসব জলাশয় সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হওয়ায় চাষ করা লাখ লাখ টন মাছ উন্মুক্ত পানিতে বেরিয়ে গেছে, যার ফলে খামারগুলো এখন পুরোপুরি মৎস্যশূন্য। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৫ উপজেলা ও মৎস্য বিভাগের বক্তব্য
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান ও পাহাড়ি ঢলের তীব্রতার কারণে ৫টি উপজেলা মৎস্য খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। এগুলো হলো: বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড এবং হাটহাজারী।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে গণমাধ্যমকে জানান:
“জেলার অনেক মৎস্য জোন এখনো গভীর পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত ও নিখুঁত হিসাব এই মুহূর্তে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে ১০৯ কোটি টাকার ক্ষতির তথ্য মিলেছে, যা চূড়ান্ত তালিকায় আরও বৃদ্ধি পাবে। মাছ ভেসে যাওয়ায় পুরো জেলায় প্রায় ১০ হাজার খামারি ও চাষি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”
তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের জরুরি পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি চিঠি পাঠানো হবে। সাধারণত এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সরকারি পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের মাঝে বিনামূল্যে উন্নত জাতের মাছের পোনা এবং পুষ্টিকর মাছের খাদ্য বিতরণ করা হয়ে থাকে, যা খামারিদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।



















