চীনের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশে একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার ফলে দেশের অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান গতি এসেছে। তবে একই সময়ে চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এবং ঋণের শর্ত নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক এখন শুধু একতরফা উন্নয়নের গল্প নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার এক সমান্তরাল বাস্তবতা।
বাণিজ্য ঘাটতি ও বাধ্যতামূলক আমদানিনির্ভরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৭% (প্রতি ৪ ডলারের আমদানির ১ ডলারই আসছে চীন থেকে)। বিপরীতে, শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে (২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মাত্র ৭৪২.৫০ মিলিয়ন ডলার)। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে এককভাবে চীনের সঙ্গেই ঘাটতি ১৭.৮৬ বিলিয়ন ডলার। তবে তৈরি পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় ২৮% কম দাম, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা ও কম লিড-টাইমের কারণে চীনের বিকল্প পাওয়া অসম্ভব। এছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় ১০ গুণ কম খরচে (দৈনিক ৬০-১০০ ডলার) চীনা প্রযুক্তিবিদদের সেবা পাওয়া যায় বলে শিল্প খাত এই প্রযুক্তিগত নির্ভরতাকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
চীনা ঋণের শর্ত, প্রকল্প ও ভিন্নমত
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২,০০০ চীনা কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে, যাদের মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। গত ২৬ বছরে চীন বিভিন্ন প্রকল্পে ৭৩৯ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ (২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ) ও কর্ণফুলী টানেলের (৫,৯১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন) মতো মেগা প্রকল্পগুলো এর অন্যতম উদাহরণ। চীন সাধারণত ২% সুদে ‘গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন’ (GCL) এবং ২-৩% সুদে ‘প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট’ (PBC) দিয়ে থাকে। তবে পিবিসি ঋণে অতিরিক্ত ফি এবং বাধ্যতামূলকভাবে চীনা ঠিকাদার ও সরঞ্জাম ব্যবহারের শর্ত থাকে, যার ফলে ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ আবার চীনা অর্থনীতিতেই ফেরত চলে যায়।
এই ঋণ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে:
- ঝুঁকি ও কৌশলগত মত: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশ্লেষক জানান, চীন মূলত ঋণের শৃঙ্খল পরিয়ে নিজেদের স্বার্থে এ অঞ্চলে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ’ (BRI) বাস্তবায়ন করতে চায়। তাই ঢাকাকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে আরও কৌশলী হতে হবে।
- ভারসাম্য ও রাজনৈতিক মত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশের মোট ঋণের ১০ শতাংশেরও কম চীনের ঋণ, যা জাপানের প্রায় সমান। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর ওপর অতি-নির্ভরতা নিয়ে আলোচনা না করে শুধু চীনের সমালোচনা করার পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা
শ্রীলংকা, পাকিস্তান বা লাওসের মতো দেশগুলো চীনা ঋণের কারণে সংকটে পড়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এক ধরনের আগাম সতর্কতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে এলডিসি (LDC) উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে চীনের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য চুক্তি’ (FTA) করার আলোচনা চলছে। তবে প্রস্তুতি ছাড়া চুক্তি করলে দেশীয় উৎপাদন খাত চীনের শক্তিশালী অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর বাইরে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে ভারত যেমন সতর্ক, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ‘ইন্ডো-প্যাসিফিক কৌশল’ নিয়ে সক্রিয়। ফলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি নিখুঁত কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

















