ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শুরুর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এমন সরাসরি ও উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট।
আজকের এই কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রেক্ষাপটের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শাহবাজ শরিফের পৃথক বৈঠক
আলোচনাকে একটি ফলপ্রসূ রূপ দিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দুই পক্ষের সঙ্গেই নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন:
- মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক: প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-এর নেতৃত্বে থাকা উচ্চপর্যায়ের দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই দলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ উপস্থিত ছিলেন।
- ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক: এর আগে তিনি ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি-র সঙ্গেও কথা বলেন।
- পাকিস্তানের অবস্থান: শাহবাজ শরিফ এই আলোচনাকে ‘মেক অর ব্রেক’ (হয় জয়, না হয় ধ্বংস) মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই সংলাপ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করবে।
২. আলোচনার প্রেক্ষাপট ও বিধ্বংসী যুদ্ধ
গত কয়েক সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলা সংঘাত বিশ্বকে এক চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে:
- ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, যা দেশটিকে চরম সংকটের মুখে ফেলে।
- মানবিক বিপর্যয়: গত পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
- হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি সংকট: পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।
৩. অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদের লক্ষ্য
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের সফল মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ দুই সপ্তাহের (১৪ দিন) এক সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
- মেয়াদ: এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হবে।
- ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড (Islamabad Accord): পাকিস্তান একটি দুই ধাপের পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে, যেখানে প্রথমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং দ্বিতীয় ধাপে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়াসহ একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করা।
৪. বর্তমান চ্যালেঞ্জ
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ইসলামাবাদে এই বৈঠকটি শুরু হলেও কিছু বিষয় এখনো অমীমাংসিত:
- লেবানন ইস্যু: ইরান দাবি করছে যে যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী লেবাননেও ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হতে হবে।
- আস্থার সংকট: ইরানি স্পিকার গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না, কারণ অতীতে আলোচনার মাঝেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
আজকের এই বৈঠক সফল হলে কেবল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরবে না, বরং বিশ্বজুড়ে দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি তেলের দাম কমে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আসতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা।



















