ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু গুম-খুনের রাজনীতির সঙ্গে নয়, তার বিরুদ্ধে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে রাজধানীতেই তার ও তার পরিবারের নামে শতকোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া নামে-বেনামে বিভিন্ন এলাকায় বিপুল অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ রয়েছে বলেও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নথিতে উঠে এসেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এর পরপরই তার পরিবারের অবৈধ সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। দুটি সংস্থার সংগ্রহ করা নথি ও নির্বাচনি হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নতুন সব তথ্য।
আইন অনুযায়ী প্রত্যেক করদাতাকে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পূর্ণ বিবরণী আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। বিবরণীর বাইরে সম্পদ থাকলে তা অবৈধ বলে গণ্য হয়। জমাকৃত রিটার্নে শেখ হাসিনা ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকারের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তার বোন শেখ রেহানা দেখান ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার। তবে দুজনেরই আয়কর নথিতে ব্যাংক লকার থাকার বিষয়টি গোপন রাখা হয়, যা আইন অনুযায়ী উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাসিনা পরিবারের নামে শতকোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে এবং ৫ আগস্টের ঘটনা পর এসব স্থাপনা থেকে প্রতিনিধির মাধ্যমে নিয়মিত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। গুলশান নিকেতন ২ নম্বর রোডের ৭২ নম্বর বাড়িটির মালিক শেখ রেহানা হলেও আয়কর নথিতে মালিকানা দেখানো হয়েছে তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি-র নামে। বাড়িটির ভাড়া তোলে একটি ডেভেলপার কোম্পানির কর্মীরা।
এ ছাড়া বারিধারা কে ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাড়িটি কাগজে-কলমে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর নামে হলেও প্রকৃত মালিকানা শেখ পরিবারের। আয়কর তথ্য বলছে, বাড়িটির মালিক শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, যার মূল্য দেখানো হয়েছে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। গুলশান-১ এর ৭ নম্বর বাড়িটিও নিজের বলে উল্লেখ করেছেন পুতুল। পাশাপাশি সেগুনবাগিচায় শেখ রেহানার একটি ফ্ল্যাটের অস্তিত্বও তদন্তে পাওয়া গেছে।
সোমবার হবিগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে দুদকের আয়োজিত গণশুনানিতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই তার সম্পত্তির একটা বিরাট রকম গোঁজামিল দিয়ে ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছেন। ওই নির্বাচনি হলফনামায় শেখ হাসিনা কৃষি সম্পত্তি ৫ দশমিক ২ একর দেখিয়েছেন। অথচ দুদকের অনুসন্ধানে ২৯ একরের সন্ধান পাওয়া যায়। সে সময় দুদক বিষয়টি নিয়ে কাজ করলেও মনোনয়ন বাতিলে পদক্ষেপ নিতে পারেনি।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা বিশ্লেষণেও বেশ কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। সেখানে দেখা গেছে—কৃষি খাত থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা; শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতে রয়েছে ২৫ লাখ টাকা; চাকরি থেকে বার্ষিক আয় ১৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা; ব্যাংক সুদ ও এফডিআর থেকে ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং রয়্যালেটি থেকে আয় ২৩ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে দেখানো হয়েছে নগদ ২৮ হাজার ৫৩০ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার ৬০৭ টাকা, সঞ্চয়পত্র ২৫ লাখ টাকা, এফডিআর ৫৫ লাখ টাকা, তিনটি মোটরগাড়ি, ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার ও ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্র। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১৫ বিঘা কৃষিজমি এবং ঢাকার পূর্বাচল ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডের ৯ নম্বর প্লট, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এছাড়া ঢাকায় ৫ লাখ টাকার ৩তলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতাংশ জমির কথাও উল্লেখ আছে।



















