বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ছিল জয়ের ছবি, ছিল উত্তেজনা আর প্রত্যাশার চাপ। কিন্তু ঘরের মাঠে সিঙ্গাপুরের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে সেই চ্যালেঞ্জ উতরাতে পারেনি বাংলাদেশ দল। এই ম্যাচকে দেশের ফুটবলের বাঁকবদলের উপলক্ষ মনে করা হলেও, স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান থেকে গেল।
ম্যাচটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল; টিকিট পেতে হাহাকার দেখা গেছে। গ্যালারিতে ২১ হাজার ৩১৭ জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যা অনেক বছর পর বাংলাদেশের ফুটবলে এমন উত্তেজনা এনেছিল। তবে সিঙ্গাপুরের জয় সেই উত্তেজনায় জল ঢেলে দিয়েছে। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের লিগে খেলেন।

ম্যাচের শুরু থেকে বাংলাদেশ রক্ষণাত্মক থাকলেও, ৫৮ মিনিটের মধ্যে ২ গোল খাওয়ার পর তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বাকি সময়ে অন্তত ৫-৬টি গোলের সুযোগ তৈরি হলেও, নতুন পোস্টার বয় হামজার শট বাইরে যায় এবং শেষ মুহূর্তে শাহরিয়ার ইমনের হেড সিঙ্গাপুরের গোলকিপার রক্ষা করেন। কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোলটি আসেনি। যদি বাংলাদেশ প্রথমার্ধেও এমন আক্রমণাত্মক খেলত, তাহলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।
সিঙ্গাপুরের ফিফা র্যাঙ্কিং ১৬১, বাংলাদেশের ১৮৩। এই ব্যবধান কমাতে বাংলাদেশ প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর ভরসা করেছিল। হামজা ও ফাহামিদুলের পাশাপাশি অভিষিক্ত শমিত সোমের ওপর ছিল সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা। শমিত প্রথমার্ধের শেষ এবং দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম দিকে দারুণ কিছু নিখুঁত পাসে সিঙ্গাপুরের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। হামজা দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে উজ্জ্বল ছিলেন। কিন্তু দিনটি তাদের কিংবা বাংলাদেশের ছিল না।
ঘরের মাঠে এই হারের পর ২০২৭ এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার স্বপ্ন ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের। চার দলের গ্রুপে সিঙ্গাপুর ও হংকং দুটি করে ম্যাচ খেলে ৪ পয়েন্ট নিয়ে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সমান ১ পয়েন্ট করে। আজ হংকংয়ের কাছে যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে পেনাল্টিতে গোল খেয়ে হেরেছে ভারত। ফলে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
ম্যাচের বিবরণ:
বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল। তবে ৪৫ মিনিটে লম্বা থ্রো থেকে বল বাংলাদেশের বক্সে আসে। গোলকিপার মিতুল মারমা বল পাঞ্চ করলেও তা বিপদমুক্ত হয়নি। এক সতীর্থের পাস থেকে সিঙ্গাপুরের মিডফিল্ডার সং উই-ইয়াং গোল করে দলকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন।
৫৬ মিনিটে হামি শাহীনের শটে গোলকিপার মিতুল বল পাঞ্চ করেন, কিন্তু সেটি সিঙ্গাপুরের তারকা স্ট্রাইকার ইখসান ফান্দির পায়ের কাছে পড়ে। ফান্দি তার সামনে থাকা হৃদয়কে ফাঁকি দিয়ে সহজে গড়ানো শটে দ্বিতীয় গোল করেন। জাতীয় দলের হয়ে ৪০ ম্যাচ খেলে এটি তার ২১তম গোল। ৬৭ মিনিটে বাংলাদেশ একটি গোল শোধ করে। হামজার থ্রু পাস ধরে রাকিব দুই সিঙ্গাপুর খেলোয়াড়ের মাঝ দিয়ে ঢুকে গোলকিপারের পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে বল জড়ান। এই গোল বাংলাদেশকে নতুন প্রাণশক্তি জোগালেও, কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোল আর আসেনি।

ম্যাচের শুরুতে ১০ মিনিটে থ্রো থেকে সিঙ্গাপুর গোলের জন্য বিপজ্জনক সুযোগ সৃষ্টি করে। ১৭ মিনিটে সিঙ্গাপুরের স্ট্রাইকার ফান্দির হেড বাইরে চলে যায়। ৩০ মিনিটে আবারও তার কাছ থেকে গোলের সুযোগ এলেও মিতুল এক হাতে শটটি সেভ করেন। মিতুলের সেই সেভ থেকে উৎসাহ পেয়ে বাংলাদেশ পাল্টা আক্রমণ করে। রাকিব সিঙ্গাপুরের গোলকিপারকে একা পেয়ে গেলেও, বলের গতি বেশি থাকায় গোলকিপার আগে হাত দিয়ে বল আটকে দেন। এরপর বাংলাদেশের হামজা ফ্রি-কিক পান, যা অল্পের জন্য সিঙ্গাপুরের বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। একটানা পাঁচটি কর্নার এলেও দ্বিতীয় গোল আসেনি। হামজাকে প্রথমার্ধে বেশি সময় নিচের দিকে দেখা গেছে কারণ সিঙ্গাপুর ছোট ছোট পাসে আক্রমণ তৈরি করছিল এবং বাংলাদেশের রক্ষণে ফাঁক দেখা দিচ্ছিল। তবে গোল খাওয়ার পর হামজাকে আক্রমণে পাঠানো হয়, কিন্তু তিনি সেভাবে জাদুকরি কিছু করতে পারেননি।
বাংলাদেশ কোচ ভুটান ম্যাচের একাদশ থেকে তিনটি পরিবর্তন আনেন: রাইটব্যাকে তাজ উদ্দিনের জায়গায় শাকিল তপু, এবং মাঝমাঠে জামাল ও সোহেল রানার পরিবর্তে মোহাম্মদ হৃদয় ও শমিত সোম। তবে এই ম্যাচেও একজন প্রথাগত স্ট্রাইকারের অভাব স্পষ্ট হয়েছে। গোল করার জন্য একজন ‘নাম্বার নাইন’ এর প্রয়োজনীয়তা এই ম্যাচে খুব ভালোভাবে বোঝা গেছে। এমন হারের রাতে আসলে কোনো সান্ত্বনা নেই। জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়েও হার, বাংলাদেশের জন্য এটা হতাশাজনক।



















