দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনার অভিযোগ কাটিয়ে বগুড়াকে আধুনিক, বাসযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য ও শিক্ষায় বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আধুনিক অবকাঠামোর ঘাটতিকে অগ্রগতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বগুড়ায় বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ, রেলক্রসিংয়ে আন্ডারপাস, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন, শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। পাশাপাশি করতোয়া নদী খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও নাগরিকসেবার মান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তাঁরা।
গতকাল বগুড়ার হোটেল মম ইন কনভেনশন সেন্টারে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন আয়োজিত ‘উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক লোটন একরামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস অনুষ্ঠানটি সহযোগিতা করে। পত্রিকাটির যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ করিম সভা সঞ্চালনা করেন।
বগুড়ার উন্নয়নে একগুচ্ছ পরিকল্পনা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বগুড়া উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র এবং আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার স্মারক পুণ্ড্রনগরীর ঐতিহ্য বহন করছে। তাঁর অভিযোগ, গত ২০ বছর বগুড়ার মানুষ উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হয়েছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগলেও বগুড়ার উন্নয়নে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়া কৃষিতে উদ্বৃত্ত একটি জেলা। এখানে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। সম্ভাবনাময় এ জেলাকে শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এ ছাড়া বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার উন্নয়নে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিসিক শিল্পপার্কের কাজও শিগগিরই শুরু হবে।
সড়ক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় উন্নয়নের তাগিদ
বগুড়ার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বিভিন্ন মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। যানজট নিরসন ও শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে প্রাথমিকভাবে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। যমুনার ভাঙনরোধ, পানি সংরক্ষণে ড্যাম্প স্টেশন নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ এবং বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মীর শাহে আলম। করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, বগুড়ার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে; সত্য প্রকাশ কারও বিরুদ্ধে গেলেও তা স্বাগত জানানো হবে।
বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা অভিযোগ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি এবং বিএনপির ঘাঁটি হওয়ায় বগুড়া উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এলাকার উন্নয়নকাজে আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের অভিযোগও তোলেন তিনি।
বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. কুদরত-ই-জাহান শিক্ষিত তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতা ঠেকাতে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. ওয়াদুদুল হক তরফদার নাহিদ কলেজটিকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রূপান্তর এবং শয্যাসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল নিয়োগের আহ্বান জানান।
যানজট, করতোয়া নদী ও নগর পরিকল্পনা
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম বলেন, নগর উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে। পরিকল্পিত সম্প্রসারণের জন্য নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় জায়গা ছেড়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান সাতমাথার যানজট নিরসনে স্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়া এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের পরামর্শ দেন। পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, জেলায় পুলিশের জনবল ও পরিবহন বাড়ানো প্রয়োজন। ৪৮টি রেলক্রসিংয়ে যানজট কমাতে আন্ডারপাস বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাজমুল হক জানান, করতোয়া নদী খনন প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নদীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা এবং শহরের যানজট কমাতে বিকল্প সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
টিএমএসএসের উপপরিচালক ডা. মতিউর রহমান বলেন, সংরক্ষণের অভাবে বগুড়ায় উৎপাদিত অনেক ফসল নষ্ট হয়। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও শিল্পকারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন অন্য বক্তারাও।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে জোর
বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, বগুড়ার উন্নয়ন হলে উত্তরাঞ্চলের আরও অনেক জেলা উপকৃত হবে। শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য জায়গা বরাদ্দ এবং শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক ড. আবদুল মজিদ প্রামাণিক কৃষি ও স্থানীয় পণ্যের উন্নয়নে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আদমদীঘির শাউওল গ্রামে বাদাম, ভুট্টা, টুপি ও কম্বলের জন্য পৃথক গবেষণার প্রস্তাব দেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক লোটন একরাম বলেন, বগুড়ার উন্নয়নে অতীতের উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। সরকার কোনো ভুল করলে গণমাধ্যম গঠনমূলক সমালোচনা করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. হোসনে-আরা বেগম, বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মুহিত তালুকদার, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, বগুড়া প্রেস ক্লাবের নেতারা, স্থানীয় সাংবাদিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা মনে করেন, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বগুড়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।


















