শনিবার , ১০ অক্টোবর ২০২৬ |
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

২৫০ কোটি টাকা লুট, তবু নির্ধারিত সময়ে বই দিতে পারবে না ২৬ ছাপাখানা

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
অক্টোবর ১০, ২০২৬ ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ করতে না পারার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ২৬টি ছাপাখানাকে ঘিরে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস, ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগি এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় সমন্বিতভাবে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করেছে।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি। ফলে অর্থ আত্মসাৎ ও দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই সরবরাহের নির্দেশ

গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ১০টি ছাপাখানার মালিককে ডেকে পাঠান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁদের মধ্যে আলোচিত জাহাঙ্গীর আলমের এক ব্যবসায়িক অংশীদারও ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেলের কাছে বই ছাপানোর অগ্রগতি জানতে চান মন্ত্রী। জবাবে রুবেল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহের আশ্বাস দেন এবং বাকি ৫ শতাংশের জন্য বাড়তি সময় চান।

তখন মন্ত্রী জানতে চান, কেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাইলেও বৈঠকে সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বৈঠকে নিম্নমানের বই সরবরাহের অভিযোগেও এক ছাপাখানার মালিককে প্রশ্ন করা হয়। ভবিষ্যতে এমনটি হবে না বলে তিনি অঙ্গীকার করেন।

নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে মুদ্রণকাজ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবারের মধ্যে মোট পাঠ্যবইয়ের ৫০ শতাংশ ছাপানোর লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ওই সময় পর্যন্ত ৩০ শতাংশেরও কম বই ছাপানো হয়েছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মুদ্রণকাজ উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রতিবছর পাঠ্যবই ছাপাতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে অধিক মুনাফা অর্জনের প্রবণতা। শেষ পর্যায়ে বই ছাপানো হলে মান যাচাইয়ের সুযোগও কমে যায়।

এদিকে, বাংলাদেশের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করতে চীনের আগ্রহ রয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এক বছরের জন্য বিনা মূল্যে সব পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাঁচটি ছাপাখানার মালিকের আশঙ্কা, দেশীয় মুদ্রণ খাতের একটি অংশের অনিয়ম ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ খাতের কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যেতে পারে। বর্তমানে এ খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দরপত্রে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত মো. জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদার এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও ছাপাখানার মালিকদের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন এবং পরে ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, শুরুতে সরকার নির্ধারিত প্রাক্কলিত মূল্য ফাঁস হয়ে যায়। এরপর ওই মূল্য বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হলে এনসিটিবি তা মেনে নেয়। পরে ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র জমা দেন এবং কাজ ভাগাভাগি করেন। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল ছাড়া অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

৪৫টি দরপত্রের অধিকাংশে সীমিত প্রতিযোগিতা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির আটটি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির চারটি এবং নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একক দরপত্র জমা পড়ে। ১৩টিতে দুটি করে এবং মাত্র দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে।

অর্থাৎ, মোট দরপত্রের প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে একটি মাত্র প্রস্তাব জমা পড়েছিল। অথচ দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে প্রতি ফর্মা ছাপানোর গড় দর নির্ধারিত হয়েছে ৩ দশমিক ৩২ টাকা এবং প্রাথমিক স্তরে ৩ দশমিক ৫৪ টাকা। বিপরীতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে গড় দর ছিল ২ দশমিক ৩১ টাকা এবং প্রাথমিক স্তরে ৩ দশমিক ৪৪ টাকা।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপাতে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

পিপিআর লঙ্ঘনের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দরপত্র প্রকাশের পর প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা হয়নি। দরপত্রে কোনো প্রস্তাব না পাওয়া গেলে পুনরায় প্রাক্কলন করে দরপত্র আহ্বান করা অথবা নির্দিষ্ট শর্তে বাজেটের সংস্থান সাপেক্ষে বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে কোনো প্রক্রিয়াই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।

পিপিআরের ৪৪(২) বিধিতে বলা হয়েছে, কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব থাকলে অথবা সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরপত্রও বাস্তবসম্মত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি হলে সব দরপত্র বাতিল করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দরপত্র প্রকাশের পর নতুন করে প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই। তাঁর অভিযোগ, এনসিটিবি এ ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত কাজ করেছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি জানার পর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

তিনি বলেন, দুদকের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন বছরের প্রথম দিন মানসম্মত পাঠ্যবই পায় এবং সরকারকে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। পরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

প্রতিষ্ঠানটি ও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করে আসা একটি ছাপাখানার মালিক প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক অংশীদার হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জাহাঙ্গীর আলম যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ ওই অংশীদারের হাতে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে দাঁড়ান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দুদকের অভিযান, তদন্তের অপেক্ষা

দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে গত মঙ্গলবার এনসিটিবির কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় দরপত্রসংক্রান্ত বেশ কিছু নথি সংগ্রহ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর গত বুধবার এনসিটিবি কয়েকজন ছাপাখানার মালিককে ডেকে নিয়ে প্রাথমিক প্রাক্কলিত মূল্য বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না—এমন বক্তব্য লিখিতভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান দরপত্রের অনিয়মের প্রতিকার দাবি করেছেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা, বইয়ের মান নিশ্চিত করা এবং দরপত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে মুদ্রণকাজের অগ্রগতি ও অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি।

সর্বশেষ - অপরাধ

আপনার জন্য নির্বাচিত