আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর চালানো এক বড় ধরনের স্থল অভিযান ও বিমান হামলায় অন্তত ২৯ জন সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। করাচি শহরে আধাসামরিক বাহিনী পাকিস্তান রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে এক আত্মঘাতী হামলায় তিন পাকিস্তানি সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঠিক পরদিনই এই বিশাল পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ এক পোস্টে এই বিশেষ সফল অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর চালানো একাধিক প্রাণঘাতী হামলার সরাসরি প্রতিক্রিয়া এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই নতুন সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হয়েছে।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তিনটি প্রদেশে নিখুঁত বিমান হামলা
পাকিস্তানি তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত পাক্তিয়া, পাক্তিকা এবং কুনার—এই তিন প্রদেশের সুনির্দিষ্ট তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত বিমান হামলা চালিয়ে যোদ্ধাদের গোপন আস্তানাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই আন্তঃসীমান্ত সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে আফগানিস্তানের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা নিন্দা জানানো হয়নি।
এই ঘটনাটির ঠিক একদিন আগে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী করাচিতে ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে একদল যোদ্ধা পাকিস্তান রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে আকস্মিক হামলা চালায়। ওই সশস্ত্র সংঘর্ষে পাকিস্তানের তিন সেনা সদস্য নিহত হন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে তিন হামলাকারীও ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সেখান থেকে এক আফগান নাগরিককে মারাত্মক আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। পাকিস্তানের নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর একটি বিচ্ছিন্ন দল ‘জামাত-উল-আহরার’ গত শনিবার রাতে এক বিবৃতির মাধ্যমে করাচি হামলার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করে।
ইসলামাবাদ-কাবুল সম্পর্কে নতুন করে চরম উত্তেজনা ও কূটনৈতিক সংকট
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রবিবারের (২৮ জুন) এই আন্তঃসীমান্ত বিমান ও স্থল অভিযান মূলত ইসলামাবাদ এবং কাবুলের মধ্যকার ইতিমধ্যে অত্যন্ত তিক্ত ও ভঙ্গুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বেশি গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এই ধরনের সশস্ত্র হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর আগে আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের ভেতরে চালানো হামলার পাল্টা জবাবে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় সামরিক সংঘাত চলছে, যাতে ইতিমধ্যে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যদিও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একাধিকবার দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনা হয়েছে এবং গত এপ্রিল মাসে চীন দুই পক্ষকে নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠকও আয়োজন করেছিল, যেখানে কোনো ধরনের উত্তেজনা না বাড়ানোর বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছিল।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ করে আসছে যে আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকার টিটিপি এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের নিজেদের ভূখণ্ডে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছে, যারা প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে মারাত্মক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তবে কাবুলের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ইসলামাবাদের এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ বরাবরই শক্তভাবে অস্বীকার করে আসছে।


















