রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের হঠাৎ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় মিছিলের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি নেতাদের মতে, এ ধরনের কর্মসূচি রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যথেষ্ট নজরদারি থাকলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা একটি রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য কর্মসূচি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো না।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় ও সুসংগঠিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সজাগ থাকলে গুলশানে এমন ঘটনা ঘটত না। তাঁর দাবি, সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছে।
গুলশানকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, বিএনপি কখনো ওই এলাকায় মিছিল করেনি। নিষিদ্ধ সংগঠনের এমন কর্মসূচিকে তিনি দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক শূন্যতার চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তাদের বিষয়ে প্রশাসনকে আরও সতর্ক থাকা উচিত।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সও ঘটনাটিকে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমন কর্মসূচি পালন করতে পারলেন।
সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর তাগিদ
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, বিষয়টি শুধু প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। দলের বড় সাংগঠনিক শক্তিকে আরও সুসংগঠিত করে রাজনৈতিকভাবেও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের কিছু অংশে সমন্বয়হীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিলে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, সরকার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা বিএনপির অনেক নেতা আগের মতো মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় ও সরকারি দায়িত্বের চাপের কারণে কোথাও কোথাও সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব তৈরি হয়েছে বলেও তাঁরা মনে করেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু স্বীকার করেন, দলটির সাংগঠনিক কাজের কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। তিনি জানান, সামনে কাউন্সিলের মাধ্যমে এসব ত্রুটি ও শূন্যতা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
‘আগেই ভালো ছিলাম’ বয়ান নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির জনপ্রিয় ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারের বিষয়টিও দলটির ভেতরে আলোচনায় এসেছে। বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর অভিযোগ, অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিভিন্ন বিতর্ক আড়াল করে ‘আগেই ভালো ছিলাম’—এ ধরনের একটি বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন এ ধরনের প্রচেষ্টাকে আওয়ামী লীগের ‘প্রেতাত্মা’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, আগের সময়ের গুম, খুন, ক্রসফায়ার, মামলা দিয়ে হয়রানি ও বাকস্বাধীনতা হরণের মতো বিষয়গুলো এখন নেই। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ টেনে রাশেদ খাঁন বলেন, এসব জাতীয় সংকট সমাধানে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে সংকটকে কেন্দ্র করে ‘আগেই ভালো ছিলাম’—এ ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ নজরদারি
বিএনপির ভেতরে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী বা বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সংগঠন, পেশাজীবী মহল কিংবা স্থানীয় বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন।
দলের একটি অংশের দাবি, কেউ কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে বিএনপির হাইকমান্ড দলের নেতাদের ভূমিকা নিয়ে নজরদারি করছে বলেও দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে।
তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
গুলশানের মিছিলে ৩২ জন গ্রেপ্তার
এদিকে গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মিছিলে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দুপুরে গুলশান-৩ নম্বর সড়কের একটি গলিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ নেতাকর্মী জড়ো হন। তাঁরা মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে যায়।
পুলিশের দাবি, এ সময় মিছিলকারীদের দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দুটি রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে।
গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনার পর রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে


















