গণভোটের রায়ের আলোকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন না করা হলে বর্তমান সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যদি বাংলাদেশে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আমরা এই সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে যাবো ইনশাআল্লাহ। আমরা শহীদদের রক্তের সঙ্গে কোনো ধরনের বেইমানি করতে পারবো না।” গতকাল রোববার (২৮ জুন) বিকেলে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের বড়লেখা উপজেলা শাখার উদ্যোগে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
৭৫ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায় ও সরকারের বিপরীতমুখী অবস্থান
বক্তব্যের শুরুতে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর ত্যাগ ও সাধারণ মানুষের অবদানের কথা স্মরণ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গত ১৭ বছরে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে এবং সবার একটাই উদ্দেশ্য ছিল—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার আমূল পতন ঘটানো। এই প্রতিশ্রুতি নিয়েই তরুণ সমাজ ও ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “নির্বাচনের আগে আমাদের একটি প্রধান এজেন্ডা ছিল সংস্কার। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ এই সংস্কারের পক্ষে এবং আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, নির্বাচনের পর আমরা দেখলাম যে সরকার সেই ৭৫ শতাংশ মানুষের রায় ও সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন না করে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছে। যেন সরকারকে কোনো ভূতে পেয়েছে। আর এই ভূত তাড়ানোর জন্যই আমরা ১১ দল রাজপথে নেমেছি এবং প্রত্যেক বিভাগে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করছি।” এরই অংশ হিসেবে আগামীতে সিলেট বিভাগেও একটি বিশাল মহাসমাবেশ আয়োজন করা হবে বলে তিনি জানান।
শেখ হাসিনার বিচার ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রত্যয়
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে এনসিপির এই মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, “ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পাঁচ লাখ লোক মারা যাবে। কিন্তু আমরা কোনো প্রতিশোধের রাজনীতিতে যাইনি, আমরা বিচারে বিশ্বাসী। ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়েছে এবং শেখ হাসিনার ফাঁসি বা সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। আমরা এখন শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছি, কবে তাঁকে দেশে এনে জনগণের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদদের রক্তের বদলা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিচারের কাঠগড়াতেই দাঁড়াতে হবে।”
পাশাপাশি ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ১৭১, ’৯০ বা ’২৪-এর শহীদরা রক্তের বিনিময়ে লিখে গেছেন যে বাংলাদেশ কারও কাছে মাথা নত করবে না। বড়লেখা সীমান্তে সাম্প্রতিক ভারতীয় অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে তিনি স্থানীয় জনগণকে সাধুবাদ জানান এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বীরের মতো সীমান্ত পাহারা দেওয়ার জন্য সীমান্তবাসীকে ‘লাল সালাম’ জানান।
বড়লেখায় ছাত্রদলের ‘ভুয়া’ স্লোগান ও গাড়ি বহরে বাধার চেষ্টা
বড়লেখা সদর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব প্রীতম দাশ, বড়লেখা উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির এমাদুল ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের নেতারা বক্তব্য দেন।
এদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে বড়লেখা স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। দুপুরের পর থেকেই বড়লেখা শহরের প্রধান প্রধান পয়েন্টে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের (ছাত্রদল ও যুবদল) নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। বিকেলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বড়লেখা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করতে গেলে একদল বিক্ষোভকারী তাঁকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে। পরবর্তীতে সভা শেষে ফেরার পথে বড়লেখা-কুলাউড়া সড়কের দক্ষিণবাজার এলাকায় তাঁর গাড়ি বহরের গতি রোধ করার চেষ্টা করে উত্তেজিত কর্মীরা। তবে পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ার আগেই ঘটনাস্থলে নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বহরকে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করে দেয়।


















