কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হওয়া সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই রায়ে পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, চারজনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় অন্য পাঁচ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার (২০ মে) দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী দেশজুড়ে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ শুনানি, ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক ও আলামত পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের তালিকা: আদালতের রায় অনুযায়ী, তানজিমকে সরাসরি ছুরিকাঘাত ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার অপরাধে জালাল উদ্দিন ওরফে বাবুল, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ এবং আনোয়ার হাকিমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ডাকাতির প্রস্তুতি ও হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অপরাধে জিয়াবুল করিম, ইসমাইল হোসেন, নুরুল আমিন, নাছির উদ্দিন ও আব্দুল করিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ সাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম, মোরশেদ আলম ও শাহ আলমকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অপরাধের সাথে সরাসরি যোগসূত্র না থাকায় আবু হানিফ, এনামুল হক ওরফে তোতলা এনাম, মো. এনাম, কামাল ওরফে ভেন্ডি কামাল ও মিনহাজ উদ্দিনকে আদালত সসম্মানে খালাস প্রদান করেন। একই ঘটনায় দায়ের হওয়া মূল অস্ত্র মামলায়ও দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে অতিরিক্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট তানজিম হত্যা মামলার রায়ের বিবরণ:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ মৃত্যুদণ্ড (৪ জন) │ ───> │ যাবজ্জীবন (৫ জন) │ ───> │ ১০ বছরের জেল (৪ জন) │
│ জালাল, হেলাল, আরিফ, আনোয়ার│ │ জিয়াবুল, ইসমাইল, নুরুল...│ │ সাদেক, আনোয়ারুল, মোরশেদ...│
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
মামলার পটভূমি ও দেশজুড়ে তোলপাড়: মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় একটি বাড়িতে একদল সশস্ত্র ডাকাত হানা দেয়। খবর পেয়ে চকরিয়া ক্যাম্পের সেনা সদস্যরা সেখানে দ্রুত ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে যান। অভিযান চলাকালীন বীর সাহসী লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন ডাকাত দলের সদস্যদের তাড়া করে একজনকে জাপটে ধরলে, ডাকাতরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই এই রেমিডিয়াল সেনা কর্মকর্তা দেশের স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
সেনাবাহিনীর মামলা ও পরিবারের সন্তোষ প্রকাশ: হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই সাথে অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি অস্ত্র মামলা করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। আজ রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম চৌধুরী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” নিহত সেনা কর্মকর্তা তানজিমের পরিবারের সদস্যরা এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। রায় শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কড়া পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।



















