খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় একটি স্টোররুমে লাগা আগুনে আইসিইউ থেকে হুড়োহুড়ি করে রোগী স্থানান্তরের সময় নাসরিন নাহার নামে এক নারী রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহত নাসরিন নাহার খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলীর মেয়ে এবং তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) চিকিৎসাধীন ছিলেন। আজ বুধবার (২০ মে) ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালের ৪ তলা প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় পুরাতন আইসিইউ ইউনিটসংলগ্ন একটি স্টোররুমে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে ওটি এবং পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডসহ পুরো হাসপাতালে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১০টি ইউনিট প্রায় এক ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
অক্সিজেন বিস্ফোরণ ও ভেন্টিলেশন খোলায় রোগীর মৃত্যু: হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ দিলীপ কুমার জানান, পুরাতন আইসিইউ ভবনের পাশের যে কক্ষে আগুন লেগেছিল, সেখানে পুরাতন কাপড় ও কিছু চিকিৎসাসামগ্রী রাখা ছিল। আগুন লাগার পর ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পুরাতন এসি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়, যার ফলে দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে যায় এবং পুরো ফ্লোরে ঘন ধোঁয়া তৈরি হয়। ধোঁয়ার কারণে ইমার্জেন্সি ওটি ও পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেলে ওটি ভবনে থাকা ১৫ জন মুমূর্ষু রোগীকে পেছনের দরজা দিয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই বিশৃঙ্খল ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে নাসরিন নাহারের স্বজনেরা হাসপাতালের নির্দিষ্ট চিকিৎসাসিদ্ধ প্রক্রিয়া না মেনেই তাঁর ভেন্টিলেশন খুলে নিজেরাই বাইরে বের করার চেষ্টা করেন। আইসিইউ থেকে বারান্দায় নেওয়ার পরপরই অক্সিজেনের অভাবে ওই নারী রোগীর মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য, একই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন শেখ আবুল হাসেম (৯৬) নামের দিঘলিয়া উপজেলার আরেক বৃদ্ধ রোগী আগুন লাগার আগেই ভোর ৫টার দিকে স্বাভাবিকভাবে মারা যান।
খুমেক হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাচিত্র:
┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐ ┌─────────────────────────┐
│ ভোর ৫:৩০ টায় ৩য় তলার │ ───> │ এসি ও অক্সিজেন সিলিন্ডার │ ───> │ হুড়োহুড়িতে ভেন্টিলেশন খুলে │
│ স্টোররুমে শর্টসার্কিট │ │ বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া │ │ নারী রোগীর বারান্দায় মৃত্যু │
└─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘ └─────────────────────────┘
তিন তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে দুই নার্সসহ পাঁচজন গুরুতর আহত: হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় রেজাউল জানান, ধোঁয়ার তীব্রতায় দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে ভেতর থেকে জীবন বাঁচাতে গিয়ে দুই সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ মোট পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন—হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান (৫০), সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী, শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মী তৌহিদ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়া নার্সদের ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করার সময় একজন সিনিয়র নার্স তিন তলার জানালা দিয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে যান। আহতদের মধ্যে দুই নার্সের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের উদ্ধার করে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতির তদন্ত: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক সরকার মো. মাসুদ সরদার জানান, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রথমে বয়রা স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিট এবং পরে ধাপে ধাপে আরও সাতটিসহ মোট ১০টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। খুমেক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. হোসেন আলী বলেন, “প্রাথমিক আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা এসির যান্ত্রিক ত্রুটি থেকেই এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।” আগুনে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওটি ও স্টোররুমের মালামাল পুড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।



















