ইসলামাবাদে গত ২১ ঘণ্টা ধরে চলা ঐতিহাসিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষই নিজেদের ‘বিজয়ী’ দাবি করে অনড় অবস্থানে থাকায় শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতিমধ্যে পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন এবং ইরানও এই ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক দাবি’কে দায়ী করেছে।
এই ব্যর্থতার পর এখন যে প্রশ্নগুলো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তার বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. যুদ্ধবিরতি কি বহাল থাকবে?
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যে দুই সপ্তাহের (১৪ দিন) অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল, তার মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল পর্যন্ত।
- বর্তমান অবস্থা: যদিও ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের কেউই যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জোর দিয়ে বলেছেন যে, শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এই বিরতি বজায় রাখা ‘অপরিহার্য’।
- ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: বিবিসি সংবাদদাতা জো ইনউড-এর মতে, এই মুহূর্তে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে। কারণ, স্থায়ী কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই দুই দেশ পুনরায় সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
২. হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি
আলোচনার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যা বর্তমানে অনিশ্চিত।
- মার্কিন অবস্থান: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই এই কৌশলগত জলপথটি ‘পরিষ্কার’ (Clearing out) করার কাজ শুরু করেছে।
- সামরিক তৎপরতা: পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা দুটি মার্কিন গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান যদি স্বেচ্ছায় এই পথ না খোলে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ‘নৌ-অবরোধ’ (Naval Blockade) বা জোরপূর্বক জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি করার কথা ভাবছে।
৩. পারমাণবিক ইস্যু: আস্থার সংকট
আলোচনা সফল না হওয়ার প্রধান অন্তরায় ছিল পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের বিপরীতমুখী অবস্থান:
- যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: ওয়াশিংটন চেয়েছিল ইরান যেন ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন একটি ‘যাচাইযোগ্য এবং চূড়ান্ত’ অঙ্গীকার করে।
- ইরানের পাল্টা যুক্তি: এক বছরের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা (বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু) ইরানের নীতি-নির্ধারকদের মনে এই ধারণা প্রবল করেছে যে, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পারমাণবিক শক্তি অর্জনই একমাত্র পথ। ফলে তারা এমন কোনো শর্ত মানতে রাজি হয়নি যা তাদের এই সক্ষমতাকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।
৪. কূটনীতির ব্যর্থতা নাকি নতুন সংঘাতের শুরু?
১৯৭৯ সালের পর প্রথমবারের মতো এই সরাসরি উচ্চপর্যায়ের সংলাপটি ইতিহাসে ‘কূটনীতির ব্যর্থতা’ হিসেবেই হয়তো চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
- ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক চাপ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমরা সব দিক থেকে বিজয়ী’ এবং ‘ইরানকে পরাজিত করেছি’—এমন মন্তব্য আলোচনার টেবিলে সমঝোতার চেয়ে উত্তেজনা বেশি ছড়িয়েছে।
- পরবর্তী পদক্ষেপ: যুক্তরাষ্ট্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা আর কোনো নতুন প্রস্তাব দেবে না। অন্যদিকে, ইরানও তাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনড়।
এখন সবার নজর ২২ এপ্রিলের দিকে। ওই দিনের পর মধ্যপ্রাচ্য কি এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে যাবে, নাকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে পুনরায় আলোচনার কোনো পথ তৈরি হবে—তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।



















