সোমবার , ২১ জুলাই ২০২৫ | ৫ই বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও পিআর-এর নামে শত শত কোটি টাকার প্রতারণা

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
জুলাই ২১, ২০২৫ ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

বিদেশে উচ্চশিক্ষা, পার্লামেন্ট রেসিডেন্সি (পিআর) ও সিটিজেনশিপের লোভ দেখিয়ে রাজধানীতে গড়ে ওঠা অসংখ্য কনসালটেন্সি ফার্ম শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট, চটকদার সামাজিক মাধ্যম বিজ্ঞাপন এবং পরিপাটি অফিসের মাধ্যমে আগ্রহী প্রার্থীদের প্রলুব্ধ করে এই প্রতারক চক্রগুলো হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে।

ইউনেসকোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। এদের বেশিরভাগই কনসালটেন্সি ফার্মের মাধ্যমে ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং বিনিময়ে ফার্মগুলো প্রত্যেকের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করে।

সূত্রমতে, সারাদেশে নামে-বেনামে দুই হাজারেরও বেশি কনসালটেন্সি ফার্ম গড়ে উঠেছে, যার অধিকাংশই রাজধানীতে অবস্থিত। এদের অনেকেই কিছুদিন পরপর অফিস পরিবর্তন করে। সরকারের সঠিক মনিটরিং না থাকায় কিছু চক্র ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছে, যার শিকার হয়ে বহু শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এটিকে মানবপাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এডুএইড: চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রতারণার কৌশল ‘এডুএইড’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম তাদের ওয়েবসাইটে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ডে স্কিলড মাইগ্রেশন, তুরস্ক, ভানুয়াতু, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় সিটিজেনশিপ, এবং হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, ইউএই ও সৌদি আরবে রেসিডেন্সির ব্যবস্থা করার দাবি করছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউকে, ইউএসএ, আয়ারল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং স্কুলিং ভিসার মাধ্যমে পরিবারকে পিআর-এর ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে।

গত মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) এই প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে এডুএইডের গুলশান অফিসে গিয়ে দেখেন, স্কিলড মাইগ্রেশনের জন্য তারা একজন প্রার্থীর কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা, স্ত্রী যুক্ত হলে ১০ লাখ এবং সন্তান যুক্ত হলে ১১ লাখ টাকা ফি নেয়। এই ফি ধাপে ধাপে নেওয়া হয় এবং তৃতীয় ধাপ পর্যন্ত গেলে টাকা আর ফেরত দেওয়া হয় না।

পিআর ও সিটিজেনশিপের জন্য আরেকজন কনসালট্যান্ট জানান, জাপানে পিআর পেতে প্রথমে সেখানে একটি অ্যাকাউন্ট করে ৩৫ হাজার ডলার জমা রাখতে হয় এবং তারা তৃতীয় দেশ থেকে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে দেন। তাদের ফি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তুরস্কের পিআর-এর জন্য ৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা তৃতীয় দেশ থেকে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয় এবং পরবর্তীতে তুরস্কের পাসপোর্টেরও ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি করা হয়।

প্রতারণার ধরণ ও আইনি দুর্বলতা: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চশিক্ষার আবেদনের ‘তৃতীয় স্টেজ’ খুবই সাধারণ একটি ধাপ এবং ভিসা না হলেও এই ধাপের ফি ফেরত পাওয়া যায় না। এডুএইড যেসব দেশে পিআর-এর কথা বলছে, তার মধ্যে ইউএই, সৌদি আরব, তুরস্ক, লাটভিয়া ও ক্যারিবিয়ানসহ অনেক দেশে এখন পিআর অনেকটাই বন্ধ। এছাড়া, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে তারা মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ করছে।

অসাধু এজেন্সিগুলো মূলত তিন ধরনের প্রতারণা করে: ১. শিক্ষার্থীদের টাকা আত্মসাৎ করে ভর্তি প্রক্রিয়া অসম্পন্ন রাখা বা বিদেশে না পাঠানো। ২. আগ্রহী প্রার্থীদের জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করা। ৩. ভিসা করে বাইরে পাঠিয়ে প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া।

কনসালটেন্সি ফার্মগুলোর কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। কেবল ‘পরামর্শক’ হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স বা কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে। এর ফলে প্রতারকরা বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাট করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মামলা বা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিলেও, বেশিরভাগ মামলা ৪২০ ধারায় হওয়ায় আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়।

‘ফরেন অ্যাডমিশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ফ্যাডক্যাব)-এর সদস্য সংখ্যা মাত্র চার শতাধিক হলেও, সারাদেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর গণমাধ্যমকে বলেন, “প্রতারণার শিকার যাঁরা হন, তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্তসাপেক্ষ অভিযান পরিচালনা করে প্রতারকদের আইনের আওতায় এনে থাকি। এছাড়াও আমাদের নিজস্ব কিছু নজরদারি থাকে। এতে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রতারণা করে এমন পাওয়া যায়, তাদের সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনা হয়।”

সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও কেলেঙ্কারি: সম্প্রতি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ট্রাভেলার এজ বিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার তিনজনের ঘটনা জানিয়েছে। সাব্বির হোসেন, শামীমুল হক ও আমিনুল ইসলাম নামের তিনজনকে কানাডায় পড়াশোনার কথা বলে যথাক্রমে ২০ লাখ, ১৫ লাখ ও ১৭ লাখ টাকা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠিয়ে অমানবিক জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে ইন্দোনেশিয়া পুলিশ তাদের আটক করে এবং তারা ১৭ দিন জেলহাজতে ছিলেন।

এছাড়াও, বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) সিআইডি বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান এম কে খায়রুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত খায়রুল বাশার ও তার স্ত্রী খন্দকার সেলিমা রওশন একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র গড়ে তোলেন। তারা ভুয়া অফার লেটার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করত এবং অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়েও নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৪৪৮ জন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রুমন আলী লস্কর অভিযোগ করেন, “বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, স্কলারশিপ ও ভিসার নামে আমাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করে। আমার মতো ভুক্তভোগীর সংখ্যা এক হাজারের বেশি। গড়ে প্রত্যেকের ২০ লাখ টাকা করে হিসাব করলে অন্তত ২০০ কোটি টাকার প্রতারণা করা হয়েছে।”

সর্বশেষ - অপরাধ