জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের রংপুরের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতা এবং মহানগর বিএনপির নেতাদের কাছে তথ্য চেয়েছে সেনাবাহিনী। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রংপুরের পায়রা চত্বরে এই জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ ও জিজ্ঞাসাবাদের বিবরণ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রাত ১২টার দিকে পায়রা চত্বরে কয়েকটি গাড়িতে করে সেনাসদস্যরা এসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ও জেলা আহ্বায়ক ইমরান আহমেদের সঙ্গে কথা বলেন। জিএম কাদেরের বাসভবন ‘দ্য স্কাই ভিউ’-তে হামলার সময়কার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখিয়ে তাঁদের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বলা হয়।
এ বিষয়ে ইমতিয়াজ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ফোন পেয়ে আমরা পায়রা চত্বরে যাই। তাঁরা হামলাকারীদের শনাক্তে আমাদের সহযোগিতা চেয়েছেন। আমরা নিশ্চিত করেছি, আমাদের লোকজনের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল না। কেউ থাকলে আমরা তথ্য দেব।”
একই স্থানে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু, সদস্যসচিব মাহফুজ উন নবী (ডন) এবং জেলা কমিটির সদস্যসচিব আনিছুর রহমান (লাকু) কেও ডাকা হয়। তাঁদের দলের দুজনের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে শনাক্ত করতে বলা হয়। শামসুজ্জামান সামু প্রথম আলোকে জানান, “ব্রিগেডিয়ার হুমায়ুন সাহেব ফোনে ডেকে নিয়ে ভিডিও ফুটেজ দেখান। বলেন, আমরা যেন সহযোগিতা করি। আমরাও বলেছি, আগামীকাল কথা বলব, প্রয়োজনে তাঁদের হাজির করব।”
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুমের বক্তব্য
পরে রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সেনাবাহিনীর ৭২ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুম, এনসিপির নেতা সারজিস আলম ও বিএনপির নেতারা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুম সাংবাদিকদের বলেন, “দেশের মানুষের বিপক্ষে যাবে, দলমত নির্বিশেষে যে খারাপ কাজ করবে, তাঁদের বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “কোনোভাবেই মানুষের ক্ষতি হয়, ভাঙচুর করা হয়, এগুলো তাদের অবস্থানকালে করার সুযোগ নেই।”
বৈষম্যবিরোধীর দুই নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে সাংবাদিকেরা ব্রিগেডিয়ার হুমায়ুন কাইয়ুমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওনারা দুজনই বলেছেন, আমাদের সহায়তা করবেন। ওনারা ভিডিও ফুটেজ ও ছবি দেখেছেন। আইডেন্টিফাই (চেনা) করতে পেরেছেন, কেউ কেউ আছেন তাঁদের দলে। যাঁদের হাতে লাঠি ও অন্যান্য জিনিসগুলো ছিল, সেগুলো থাকার কথা ছিল না। তাঁরা বিব্রতবোধ করেছেন এবং কথা দিয়েছেন আজ রোববার তাঁদের হাজির করবেন। ভবিষ্যতে এমন কোনো কাজ করবেন না তাঁদের দল থেকে যেটা রংপুরের শান্তি বিনষ্ট করবে।”
এনসিপি নেতা সারজিস আলমের মন্তব্য
সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপের খবর পেয়ে রাত দেড়টার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। তিনি এখানে ৭২ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুমের সঙ্গে কথা বলেন। পরে রাত দুইটার দিকে বৈষম্যবিরোধীদের দুই নেতাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়েন সারজিস।
সারজিস আলম সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এ বিষয়ে তদন্তের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাউকে হোক, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির যে কাউকে হোক, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আমরা মনে করি, রাত একটা-দুইটা এটা আসলে ভালো…, মানে ওই সময়টাই দৃষ্টিকটু দেখায়। বরং আমরা প্রত্যাশা করি, তাঁদের যদি যেকোনো টাইমে (সময়ে) দিনের বেলা অফিস আওয়ারে ডেকে নেওয়া হয়, সবাই প্রস্তুত থাকবে এ বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য।”
এর আগে রাত একটার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে সারজিস আলম লেখেন, “রংপুরে ফ্যাসিস্টের দোসরদের গ্রেপ্তার না করে সহযোদ্ধাদের বিব্রত করা হলে, আগামীকাল রাজপথে দেখা হবে।” ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে সারজিস আলম রংপুরের পায়রা চত্বরে হাজির হন। তাঁর ভাষ্যমতে, পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাওয়ার পথে তিনি যখন রংপুর অতিক্রম করছিলেন, তখনই জানতে পারেন সেনাবাহিনীর একটি দল বৈষম্যবিরোধী নেতাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তিনি বলেন, “জিএম কাদেরের রংপুর আগমন এবং সাবেক মেয়র মোস্তফাকে পুনর্বহালের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা থেকেই অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীনদের ডামি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছে।”
এই ঘটনা রংপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


















