কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভের প্রায় এক হাজার ফুট গভীর থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন আপাতত জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ না কমা পর্যন্ত আগুন নেভানো বা গ্যাস নির্গমনের পথ বন্ধ করা যাবে না। এতে ভূগর্ভে গ্যাস জমে উচ্চচাপ তৈরি এবং বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার বিকেলে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েবের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এদিকে, নিরাপত্তার স্বার্থে গ্যাস নির্গমনস্থলের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করেছে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে শিলা ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তবে গ্যাসের প্রবাহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় এখনো গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
বাপেক্স কর্মকর্তা এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, সংগৃহীত শিলা ও পানির নমুনা বাপেক্সের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত গ্যাসের উপাদান বা প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, পেট্রোবাংলা ও বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
পেট্রোবাংলা গ্যাস নির্গমনের স্থান ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরির সুপারিশ করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্যাস নির্গমনের কেন্দ্র থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে ‘রেড জোন’, ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে ‘নো ফায়ার জোন’ এবং ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাকে ‘অবজারভেশন জোন’ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে।
এ নির্দেশনার আলোকে শুক্রবার সকাল থেকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করেছে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন। এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
গত বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. শোয়েবের সভাপতিত্বে সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন-২), উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার, কক্সবাজারের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন) মাহমুদুর রহমান, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। কক্সবাজারে অবস্থানরত বাপেক্সের কারিগরি দলও অনলাইনে সভায় যুক্ত হয়।
সভা শেষে সিদ্ধান্ত জানিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েবের সই করা চিঠি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্যাস নির্গমনের স্থানে আগুনের শিখা কোনোভাবেই নেভানো যাবে না এবং গ্যাস বের হওয়ার পথ খোলা রাখতে হবে। গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তা ভূগর্ভে জমে উচ্চচাপ তৈরি করতে পারে। এতে বিস্ফোরণের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহের পরিমাণ, গতিপ্রকৃতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রবাহ ধীরে ধীরে কমে এলে একপর্যায়ে তা প্রাকৃতিকভাবেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে ১৫ দিনেও প্রবাহ না কমলে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের রেড জোনে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে ১০০ মিটার পর্যন্ত নো ফায়ার জোনে ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ আগুন কিংবা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে—এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে। এ ছাড়া ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের পর্যবেক্ষণ জোনে বাপেক্সের কারিগরি দলের তত্ত্বাবধানে নতুন কোনো স্থানে গ্যাস নির্গমন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নো ফায়ার জোনের মধ্যে থাকা বৈদ্যুতিক লাইনগুলোর ওপরও সার্বক্ষণিক নজরদারির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বাড়িয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞ দলকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন গ্যাস নির্গমনের স্থান থেকে ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করতে বলা হয়েছে।


















