বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি ধাওয়া করেছিলেন বলে দাবি করেছেন তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। ওই দুজনের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন বলে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে এসব তথ্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত নয়। সেগুলো যাচাই করে দেখছে তদন্ত সংস্থাটি।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বন্ধু দীপকে হেফাজতে নিয়েছে পিবিআই। তাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছেন তদন্তকারীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তারা একটি নির্দিষ্ট স্থানে কথা বলছিলেন। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন তাদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। আর দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ তুরাগ তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়েছিলেন। পরে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে চলে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে বাড়ি ফেরেন।
এত রাতে তারা ঘটনাস্থলে কেন গিয়েছিলেন—এমন প্রশ্নে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জায়গাটি মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত। বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় যাচাই-বাছাই ছাড়া এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
শুক্রবার দুপুরে পিবিআইয়ের একটি দল দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকার তুরাগ নদীর তীর পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।
দীপের সব তথ্য বিশ্বাস করছে না পিবিআই
তবে দীপের দেওয়া সব তথ্য এখনই বিশ্বাস করছে না তদন্ত সংস্থাটি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘দীপ নানা তথ্য দিয়েছে। সেই তথ্যগুলো সব আমরা বিশ্বাসও করছি না। প্রতিটি তথ্য ও বিষয় আমরা যাচাই করে দেখছি।’
পুলিশের মতো পোশাক পরা ব্যক্তিরা তাদের ধাওয়া করেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে তারা দৌড়ে পালান। তবে ওই দুই ব্যক্তি কারা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, ঘটনাস্থলটি একটি খোলা মাঠ, যার তিন দিকেই নদী। দীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ও প্রযুক্তিগত তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দীপ অনেক তথ্য দিয়েছেন। তবে যাচাই না করে সেসব তথ্য প্রকাশ করলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌপুলিশের পাশাপাশি ছায়াতদন্ত করছে পিবিআই। অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, নৌপুলিশ বাংলাদেশ পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। পিবিআইও পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা। নৌপুলিশের তদন্তে সহায়তা করতেই তারা ছায়াতদন্ত চালাচ্ছেন।
ঘটনাসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কিছু ফুটেজ বিভ্রান্তিকর হওয়ায় প্রতিটি ফুটেজ ও তথ্য সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা। সবকিছু যাচাই শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নম্বরপ্লেটহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, নদী থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। এর মালিকানা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটিও নম্বরপ্লেটবিহীন ছিল বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুল ইসলাম জানান, শুক্রবার ভোররাতে টহল ডিউটির সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সেনাকল্যাণ ভবনসংলগ্ন হোন্ডারোডে পরিত্যক্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। পরে সেটি থানায় নেওয়া হয়। পিবিআই থানা থেকে মোটরসাইকেলটি নিয়ে গেছে।
মোটরসাইকেলটির বিষয়ে পিবিআই অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘আমরা একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছি। এটি তাহসিফের কিনা সেটি যাচাই করা হচ্ছে। আমাদের ধারণা, মোটরসাইকেলটি তাহসিফের।’
ঘটনাস্থল ও মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে প্রশ্ন
দীপকে নিয়ে তুরাগ নদীর তীর পরিদর্শনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লাইভ ভিডিও প্রচারিত হয়। ওই ভিডিওতে দীপকে বলতে শোনা যায়, মাজার বস্তি এলাকার ২৯ নম্বর পিলারের আড়ালে তিনি অবস্থান করছিলেন। তার কিছুটা পেছনে একটি ভবনের সিঁড়িতে ছিলেন তাহসিফ।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের দৃষ্টি এড়াতে তিনি পিলারের আড়ালে ছিলেন। এ সময় পুলিশের পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন বলেও ভিডিওতে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২৯ নম্বর পিলার থেকে তুরাগ নদীর দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ। অন্যদিকে, মাজার বস্তির তুরাগ তীর থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান রাজাবাড়ী ঘাট ডিএমপির উত্তরখান এলাকায়। ফলে তাহসিফের মরদেহ কীভাবে রাজাবাড়ী ঘাটে পৌঁছাল, সেটিও তদন্ত করে দেখছেন কর্মকর্তারা।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেনি পিবিআই। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য যাচাই শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।


















