সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

সার সংকটের মধ্যেই মিয়ানমারে পাচার, বিপাকে আমন চাষিরা

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ ৯:০১ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

দেশজুড়ে ইউরিয়া ও টিএসপি সারের সংকটের মধ্যেই প্রতিবেশী মিয়ানমারে সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। সীমান্ত ও উপকূলীয় বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র সার পাচার করছে বলে সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা। সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।

রোপা আমন চাষের মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না সার। আবার কোথাও কালোবাজারে নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও ভোলার উপকূলীয় এলাকা ব্যবহার করে সার পাচার করা হচ্ছে। সর্বশেষ ভোলার তজুমদ্দিনের মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ৮ হাজার কেজি ইউরিয়া সার জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড।

এর আগে ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ৪১০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। পরদিন হালিশহরের দবিরখাল এলাকায় একটি ট্রাক থেকে ফিশিং বোটে নেওয়ার সময় ২২০ বস্তা বা ১১ হাজার কেজি সার জব্দ করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে প্রায় ৩০ টন সারসহ একটি ট্রাক আটক করা হয়। এর আগে ৩০ জুন উখিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে বিজিবি। দুই মাসে আটটি চালানে মোট ৩ হাজার ৩১০ বস্তা সার জব্দের তথ্য পাওয়া গেছে।

কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সার ছোট-বড় নৌযানে তুলে উপকূলীয় পথ ধরে মিয়ানমারের দিকে নেওয়া হচ্ছে। একের পর এক চালান আটক হলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

লাভের আশায় পাচার

বাংলাদেশে সরকারি মূল্যে এক বস্তা ইউরিয়া সার প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও মিয়ানমারে একই সার বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ফলে বড় ধরনের মূল্য ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা বিপুল মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে সরকারি দামে সবসময় সার না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পাচারকারীরা দেশে প্রতি বস্তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে সার সংগ্রহ করে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রামু বিজিবি সেক্টরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সার চোরাচালান ঠেকাতে কক্সবাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় কালোবাজারির অভিযোগ

সারের সংকট শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এর প্রভাব পড়েছে। রাজশাহীর পবায় প্রকৃত কৃষকরা সার না পেলেও কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে গোপনে একাধিক ব্যক্তির কাছে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্রির ভাউচারও দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

সাতক্ষীরায় আমন মৌসুমের শুরুতে সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকার পরও বিপণন ব্যবস্থার অনিয়ম ও অসাধু চক্রের কারসাজিতে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ‘প্যানিক বায়িং’ তৈরি করে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

লালমনিরহাটে সারের সংকট ও ডিলারদের কারসাজির অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। টাঙ্গাইলের মধুপুরে কালোবাজারে সার পাচারের সময় ৩৯৫ বস্তা সারসহ এক ট্রাকচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিলেট, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকাতেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বর্তমানে পরিবেশকের দোকানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও বাইরের দোকানে তা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সার না পেয়ে দোকানে দোকানে কৃষক

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আমনচাষি আসাদুজ্জামান আসাদ কয়েকদিন ধরে ডিলারের দোকানে ঘুরেও সার পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। দিনাজপুরে ৫০ কেজির এক বস্তা সার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

কুড়িগ্রামেও কৃত্রিম সংকটের কারণে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খুলনায় পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কালোবাজারে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। যশোর, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়াতেও কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

যশোরের ঝিকরগাছার এক কৃষক জানান, সংকটের কারণে খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণ দামে ২০ কেজি টিএসপি কিনতে হয়েছে। সদর উপজেলার আরেক কৃষক কয়েকদিন দোকানে ঘুরে ২৫ কেজি টিএসপি পেলেও প্রায় দ্বিগুণ দাম দিতে হয়েছে। জামালপুরেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পর্যাপ্ত মজুত আছে: কৃষি মন্ত্রণালয়

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি—চার ধরনের সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ১২ লাখ ২৯ হাজার ৪০০ টন সার মজুত রয়েছে।

এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮০০ টন, ডিএপি ৩ লাখ ৩২ হাজার ৪০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ১৭ হাজার ২০০ টন।

গত অর্থবছরের একই সময়ে ইউরিয়া মজুত ছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৮০০ টন, টিএসপি ১ লাখ ৮৭ হাজার ১০০ টন, ডিএপি ২ লাখ ৮৯ হাজার ১০০ টন এবং এমওপি ২ লাখ ৯৮ হাজার টন।

সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া ২ লাখ ২৬ হাজার ৩০০ টন, টিএসপি ৪৮ হাজার ২৫ টন, ডিএপি ১ লাখ ৮০ হাজার টন এবং এমওপি ৬৮ হাজার ৭২৬ টন বরাদ্দ রয়েছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে এর সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এর বাইরে পাইপলাইনে রয়েছে আরও সাড়ে ৪ লাখ টনের বেশি সার। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪৪ হাজার টন, টিএসপি ৭০ হাজার ১০০ টন, ডিএপি ৭৬ হাজার টন এবং এমওপি ২ লাখ ৬৮ হাজার টন।

কৃষি সচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, সার নিয়ে একটি চক্রান্তের চেষ্টা হয়েছিল, তবে মনিটরিংয়ের কারণে তা সফল হয়নি। বর্তমানে সারের মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক দাবি করে তিনি জানান, সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মাঠপর্যায়েও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং চট্টগ্রামে আরও দুটি সারবাহী জাহাজ ভিড়েছে। ফলে সার নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের সার সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় অনিয়ম থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক ও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা গেলে বর্তমান সংকট দ্রুত কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সর্বশেষ - অপরাধ