লোডশেডিং কমানো এবং শিল্প খাতের গ্যাস সংকট নিরসনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের মাধ্যমে তাদের জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। বকেয়া পরিশোধের পর আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে লোডশেডিং কমানোর পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপও কমবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, বর্তমানে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বকেয়া বিল পরিশোধ করা হলে আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সূত্র বলছে, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তা ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে।
এদিকে, ফার্নেস অয়েলের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়াতে আমদানিও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগের পেছনে অন্যতম কারণ শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমনকি স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেছেন, সরকার লোডশেডিং কমাতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়ানো উচিত নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র চালু করা শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত স্বল্পমেয়াদি সমাধান হতে পারে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের পরিকল্পনা সফল হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটও কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


















