২০২৪ সালের ৪ আগস্ট—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও রক্তক্ষয়ী দিন। মূলত এই দিনটিতেই নির্ধারিত হয়েছিল ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের চরম পরিণতি। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মূল টার্নিং পয়েন্ট ছিল আন্দোলনকারীদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ৩ আগস্ট শহিদ মিনারের বিশাল গণজমায়েত থেকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনের সিদ্ধান্ত নিলেও ৪ আগস্টের নজিরবিহীন প্রাণহানি, দেশের উদ্ভূত চরম পরিস্থিতি এবং সরকারের ভেতরে থাকা গোপন ছকের খবর পেয়ে তা তড়িঘড়ি করে একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ঘোষিত কর্মসূচি বানচাল করতে ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ র্যাব, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে রাজধানীতে এনে আকাশ ও স্থলপথে পুরো ঢাকা কঠোরভাবে অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তবে প্রশাসনে থাকা সরকারবিরোধী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই নীলনকশার তথ্য আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের কাছে পৌঁছে গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্দোলন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৪ আগস্ট রাতে সমন্বয়কদের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সরকারের সামগ্রিক প্রশাসনিক ছক সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়ে যায়।
৪ আগস্ট সকাল থেকেই শেখ হাসিনার এক দফা পদত্যাগের দাবিতে সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমনে মোবাইল ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করা হলেও লাখ লাখ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। দিনভর রাজধানী ঢাকাসহ সিরাজগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, সিলেট ও অন্যান্য জেলায় পুলিশ ও সরকারি দলের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষে প্রায় ৯৮ জন নিহত হন। সেই সাথে রাওয়া ক্লাবে সাবেক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও সহিংসতা বন্ধের প্রবল চাপ তৈরি হয়।
পরদিন ৫ আগস্ট সকালে সমন্বয়কদের ডাকে সাড়া দিয়ে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ মিছিল নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উদ্ভূত সংকটে সামরিক বাহিনীর অবস্থান এবং জনতার উত্তাল স্রোতের মুখে ৫ আগস্ট দুপুরেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৩৬ দিনের তীব্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং সহস্রাধিক শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।


















