কর্মব্যস্ত নগরজীবনে গণপরিবহনের গতি বাড়াতে ঢাকায় আরও তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) ও এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার মেট্রোরেল চালু রয়েছে। এটি দেশের প্রথম মেট্রোরেল। তবে রাজধানীর ৩০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার ক্রমবর্ধমান পরিবহণ চাহিদা বিবেচনায় আরও কয়েকটি মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুমোদিত তিন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সম্মিলিত সংশোধিত ব্যয় ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। মূল অনুমোদনের তুলনায় এই দুই প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আর নতুন প্রকল্প হিসেবে এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, নগরায়ণ দ্রুত বাড়ার সঙ্গে আধুনিক গণপরিবহনের চাহিদাও বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণ এবং নগর চলাচল ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় ভবিষ্যতে আরও মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে।
এমআরটি লাইন-১
দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল হিসেবে পরিকল্পিত এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন পেয়েছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
সংশোধিত পরিকল্পনায় প্রকল্পটি ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা।
প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ রয়েছে ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সরকার বহন করবে। প্রতিদিন গড়ে ৮ লাখ যাত্রী এই রুটে চলাচল করবেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকল্পে মোট ২১টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি পাতাল এবং ৭টি উড়াল স্টেশন হবে বলে প্রকল্পের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) রুটের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সংশোধিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ৪৮ হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এই প্রকল্পে জাপানের ঋণ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং সরকারের অর্থায়ন ২২ হাজার ৩৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা।
রুটটির ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল ও ৫টি উড়াল স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২৮ সালে শেষ করার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় সময় বাড়িয়ে ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। এ রুটে প্রতিদিন গড়ে ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ)
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন থাকবে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এই রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি পাতাল এবং ৪টি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
প্রাথমিক হিসাবে এ রুটে প্রতিদিন গড়ে ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
মেট্রোরেল রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করা হলেও প্রকল্পগুলোর বিপুল ব্যয়, নির্মাণপদ্ধতি এবং ঠিকাদার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেট্রোরেলের দরপত্র প্রক্রিয়া ক্রমেই সীমিত টেন্ডারিংয়ের দিকে যাচ্ছে। তাঁর মতে, প্রকল্পের নকশা ও নির্মাণপদ্ধতিতে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে নির্দিষ্ট দেশের ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ বেশি তৈরি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকায় বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির আওতায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ার তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
পাতাল মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে, পাতাল রেলব্যবস্থায় সার্বক্ষণিক কৃত্রিম আলো, বায়ু চলাচল এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখতে হয়। ফলে মেট্রোরেল নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উন্নয়নমূলক বড় প্রকল্প নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে রাজধানীর পরিবহণব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পাতাল মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেশি হলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে দ্রুত ও গণভিত্তিক যোগাযোগের সুযোগ আরও বাড়বে। তবে প্রকল্পগুলোর বড় ব্যয়, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণই হবে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


















