টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে দেশের সাতটি জেলায় এক ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আজ রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) দুপুরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন নাগরিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুর্গত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ সাতটি জেলা হলো—খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা বর্তমানে প্লাবিত রয়েছে। এর ফলে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৪৪ group হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা।
জেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতি ও সর্বশেষ পরিস্থিতি খতিয়ান
| জেলা ও প্লাবিত অঞ্চল | পানিবন্দি পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ | প্রাণহানি ও আহত | আশ্রয়কেন্দ্র ও বর্তমান বাসিন্দা |
| চট্টগ্রাম (১৬ উপজেলা, ১৫২ ইউনিয়ন) | ১,৪৮,৫০০ পরিবার / ৫.৯৫ লাখ মানুষ | ১৩ জন মৃত / ১২ জন আহত | ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র / ২১,৯০০ জন বাসিন্দা |
| কক্সবাজার (১০ উপজেলা, ৭০ ইউনিয়ন) | ৩৯,৫০৬ পরিবার / ১.৫৮ লাখ মানুষ | ২৮ জন মৃত (১৩ রোহিঙ্গা) / ২৪ জন আহত | ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র / ১,৫৮০ জন বাসিন্দা (১ নিখোঁজ) |
| বান্দরবান (৭ উপজেলা, ৩৪ ইউনিয়ন) | ১২,৫০০ পরিবার / ৮,৩৫০ জন মানুষ | ৬ জন মৃত / ২ জন আহত | ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র / ৬,২৫০ জন বাসিন্দা |
| রাঙ্গামাটি (৯ উপজেলা, ৪৩ ইউনিয়ন) | ১,০৪৪ পরিবার / ৩,৫২৪ জন মানুষ | ৩ জন মৃত / ০ জন আহত | ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র / ৩,৬৩৭ জন বাসিন্দা |
| খাগড়াছড়ি (৯ উপজেলা, ৩৩ ইউনিয়ন) | ১,০৭৩ পরিবার / ৩৪,৪১৭ জন মানুষ | ০ জন মৃত / ১ জন আহত | ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র / ২,৮৮৩ জন বাসিন্দা |
| মৌলভীবাজার (৫ উপজেলা, ৩১ ইউনিয়ন) | ৭,৩০৮ পরিবার / ২৬,৫৪৪ জন মানুষ | ১ জন মৃত / ০ জন আহত | ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র / ২,১৭২ জন বাসিন্দা |
| হবিগঞ্জ (৩ উপজেলা, ৫ ইউনিয়ন) | ৬,৪৪৪ পরিবার / ২৮,১৪০ জন মানুষ | ০ জন মৃত / ০ জন আহত | ২টি আশ্রয়কেন্দ্র / বর্তমানে কেউ নেই |
সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ ও মানবিক সহায়তা প্যাকেজ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত এই অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত সাতটি জেলার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দেশের সামগ্রিক ৬৪ জেলার জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে মোট ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (NGO) প্রত্যক্ষ সহায়তায় দুর্গত মানুষের মাঝে জিআর চাল, নগদ অর্থ, শুকনো ও রান্না করা খাবার, শিশুখাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং ঘরবাড়ির জন্য ঢেউটিন বিতরণ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, মাঠপর্যায়ের বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আরও অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রী ও আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হবে।


















