দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই গণমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন মহলে তীব্র নিন্দার ঝড় অব্যাহত রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো এবং কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে এই বর্বরোচিত তান্ডব চালায়। কেবল ঢাকাই নয়, কুষ্টিয়া, খুলনা ও সিলেটেও প্রথম আলোর আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশালেও হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। একই রাতে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে প্রবীণ সাংবাদিক ও ‘নিউ এজ’ সম্পাদক নূরুল কবীরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করার ঘটনাটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শনে আসেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। মাহমুদুর রহমান মান্না ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে এসে এই হামলা চালানো হলেও প্রশাসন তা ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি গত বছর প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই করে বিক্ষোভের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, নুরুল হক তার বক্তব্যে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এবং ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এই ধরনের নাশকতা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি মনে করেন, একটি স্বার্থান্বেষী ‘তৃতীয় পক্ষ’ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই হামলাগুলো ঘটিয়েছে।
সংবাদপত্রের কার্যালয়ে এই নগ্ন হামলার প্রতিবাদে সারা দেশের সাংবাদিক সমাজ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠন পৃথক বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো পত্রিকার ওপর হামলা নয়, বরং জনগণের জানার অধিকার রুদ্ধ করার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ভয়ভীতির মাধ্যমে দমনের এক গভীর ষড়যন্ত্র। সিলেটের ব্যবসায়ী সমাজ, আইনজীবী, কবি ও নাট্যব্যক্তিত্বসহ কয়েক শ মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। নাটোরে কর্মরত সাংবাদিকরা মানববন্ধন করে সরকারের নিস্ক্রিয়তার কঠোর সমালোচনা করেছেন। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সিপিবি ও উদীচীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ওসমান হাদী হত্যার বিচার এবং গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে সরব হয়েছে। কুষ্টিয়ায় হামলার শিকার প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদপত্রের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও এই ঘটনাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। সংশ্লিষ্ট সকলে একমত হয়েছেন যে, একটি আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা অপরিহার্য।



















