টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামে মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই, ২০২৬) বিকেল ৪টার দিকে মনু নদের এই অংশে বানের পানি উপচে পড়লে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) স্থানীয়দের সাথে নিয়ে হাজার হাজার বালির বস্তা ফেলে বন্যা প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। পানির তীব্র স্রোতে বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধ ভাঙার ফলে নদীর পানি প্রচণ্ড বেগে লোকালয়ে প্রবেশ করায় হরিপাশা, উজিরপুর, কান্দিরকুল ও একামধু গ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আশপাশের নতুন নতুন জনপদেও পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।
বাঁধের ওপর খোলা আকাশে আশ্রয় নিচ্ছেন দুর্গতরা
হঠাৎ করে ২০০ ফুটের এই বিশাল ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় রাজনগর উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নিম্নাঞ্চলের শত শত পরিবার তাদের হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু এবং জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানের খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে একামধু গ্রামের বাসিন্দা মখদ্দছ মিয়া ও আলী হোসেন জানান, হঠাৎ করে বাড়িতে কোমরসমান পানি ওঠায় তাঁরা সন্তানদের নিয়ে মনু নদের অক্ষত প্রতিরক্ষা বাঁধের ওপর এসে খোলা আকাশে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন পরিবারের খাওয়া-দাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে, তা নিয়ে তাঁরা চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। একই চিত্র দেখা গেছে কান্দিরকুল গ্রামের প্রীতি রানী ও ফয়জুন নেছা বেগমের ক্ষেত্রেও; তাঁরাও গবাদিপশু ও জরুরি আসবাবপত্র নিয়ে বাঁধের উঁচু জায়গায় অবস্থান নিয়েছেন।
প্রধান নদীগুলোর পানি পরিস্থিতি ও পাউবোর পরিসংখ্যান
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে:
| নদীর নাম ও পরিমাপক পয়েন্ট | বর্তমান পানি প্রবাহের চিত্র (১০ জুলাই, ২০২৬) |
| মনু নদী (রেলওয়ে এলাকা) | বিপৎসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। |
| মনু নদী (চাঁদনীঘাট অংশ) | বিপৎসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। |
| ধলাই নদী | বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। |
| কুশিয়ারা নদী | বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। |
| জুড়ী নদী | বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। |
উপজেলা প্রশাসনের মাইকিং ও শুকনো খাবার বিতরণ
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিপুল সিকদার বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান, যে স্থানে মনু নদের বাঁধটি ভেঙেছে, পানির তীব্র স্রোতের কারণে তা এই মুহূর্তে কোনোভাবেই আটকানোর মতো অবস্থায় নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকার মানুষকে অনতিবিলম্বে গবাদিপশুসহ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে অনবরত সতর্ক করা হচ্ছে। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যদি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে তবে প্লাবিত এলাকার পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বর্তমানে জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ পাওয়া শুকনো খাবার বন্যাদুর্গত ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া বিপন্ন মানুষদের মাঝে জরুরি ভিত্তিতে বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


















