জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা আরও জোরদার করা, শান্তিরক্ষীদের পেশাদার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত চৌকস পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্টের (DOS) আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারের সঙ্গে এই ফলপ্রসূ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠকের বিশদ বিবরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশের সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের সামগ্রিক পরিচালনাগত সহযোগিতা, বকেয়া প্রতিপূরণ (রিইমবার্সমেন্ট) দ্রুত নিষ্পত্তি, মিশন এলাকার পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ কন্টিনজেন্ট প্রেরণের প্রস্তুতিসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
পরিবেশবান্ধব মিশন ও নারী শান্তিরক্ষীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের আহ্বান
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা একটি অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা মিশনের পরিবেশগত ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিজস্ব উদ্যোগে সৌর প্যানেল (Solar Panels) স্থাপনকারী বিশ্বের প্রথম দেশ হলো বাংলাদেশ। এই অনন্য ও সফল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত মিশন এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও ব্যাপকভাবে বাড়াতে বাংলাদেশ গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছে। এর পাশাপাশি তিনি নারী শান্তিরক্ষীদের বৈশ্বিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে জোর দেন এবং তাদের জন্য নিরাপদ, উপযোগী ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব ও নারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রতিকূল ও চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
হাইতিতে সোয়াত ও সাইবারসহ ৩টি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েন
বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল হাইতি সংকট। সালাহউদ্দিন আহমদ জাতিসংঘকে জানান যে, হাইতির বর্তমান অস্থিতিশীল ও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ পুলিশ সেখানে তিনটি বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট (FPU) মোতায়েনের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এই বিশেষায়িত কন্টিনজেন্টগুলোতে বাংলাদেশের চৌকস কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সোয়াত (SWAT), র্যাপিড রেসপন্স টিম, আধুনিক বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ (EOD) দল, ফরেনসিক ল্যাব এক্সপার্ট, সাইবার অপরাধ তদন্ত শাখা, নৌ-অভিযান ও মাদকবিরোধী বিশেষ কমান্ডো অভিযানের মতো অনন্য পেশাদার সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, এই কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের আইনি ও কৌশলগত সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় অংশ নিতে আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশের তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিউইয়র্ক জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৌঁছাবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রয়োজনে অন্যান্য পুলিশ অবদানকারী দেশের (PCC) সঙ্গে যৌথভাবে (Co-deployment) বিশেষায়িত পুলিশ দল মোতায়েন করতেও বাংলাদেশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা
বৈঠকের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীল পতাকার (Blue Helmet) অধীনে বাংলাদেশের সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের পেশাদারিত্ব এবং জাতিসংঘের আধুনিক লজিস্টিক সহায়তার যৌথ সমন্বয়ে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আরও বেশি গতিশীল ও শক্তিশালী হবে।
জবাবে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধবিক্ষুব্ধ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের অসামান্য পেশাদারিত্ব, অতুলনীয় সাহসিকতা এবং কঠোর শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষায় মিশন এলাকায় বাংলাদেশের নেওয়া অগ্রগামী গ্রিন-উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন এবং হাইতিতে বাংলাদেশের এই ত্রিমুখী বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের প্রস্তাবসহ ঢাকার উত্থাপিত সবকটি দাবি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত বিবেচনার স্পষ্ট আশ্বাস দেন।


















