মঙ্গলবার , ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
  1. অপরাধ
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. এভিয়েশন
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. ছবি
  10. জনদুর্ভোগ
  11. জনপ্রিয়
  12. জাতীয়
  13. ডেঙ্গু
  14. দুর্ঘটনা
  15. ধর্ম

খাদ্য বিভাগে সিন্ডিকেটের দাপট, বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ

Spread the love

সরকার পরিবর্তন হলেও খাদ্য বিভাগের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র বদলায়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাদ্যগুদাম ঘিরে দালাল, ফড়িয়া, মিলার ও প্রভাবশালী মহলের সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় প্রকৃত কৃষক সরকারি গুদামে সরাসরি ধান-চাল সরবরাহের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি ব্যবস্থায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনার উদ্যোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। কোথাও আবার চুক্তিবদ্ধ মিলারের নিজস্ব চালকল না থাকলেও অন্যের মিল ব্যবহার করে সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের সুযোগ পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তালিকাভুক্ত মিলারদের একটি বড় অংশের নিজস্ব চালকল নেই। তাঁরা ভাড়ায় চালিত চালকল অথবা অন্যের মিলকে নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মে স্থানীয় খাদ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এবং মিলারদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।

রংপুর, নওগাঁ ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত মিলারদের বড় একটি অংশের নিজস্ব মিল বা চাতাল না থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এ কারণে কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র, কৃষক তালিকা ও মোবাইল নম্বর ব্যবহারে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং সরকারি দামে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

বরিশালে গুদাম ঘিরে কালোবাজারির অভিযোগ

বরিশালের খাদ্য সংরক্ষণ গুদামগুলোতে চাল, গম ও আটা নিয়ে অনিয়ম এবং কালোবাজারির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা-কর্মচারী, ওএমএস ডিলার ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশের যোগসাজশে সরকারি খাদ্যশস্যের একটি অংশ গুদাম থেকে বের হওয়ার আগেই বিক্রি করে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজনের দাবি, ওএমএস ডিলার ও জনপ্রতিনিধিরা গুদাম থেকে পণ্য উত্তোলনের পর একটি অংশ বিক্রি করে দেন। পরে নতুন পণ্য গুদামে আনার সময় বিক্রি করা অংশের সমপরিমাণ পণ্য মাঝপথে কালোবাজারে চলে যায়।

অভিযোগে গুদামের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. শাহাবুদ্দিনের নামও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, একজন ওএমএস ডিলার রবি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন এক টন চাল ও এক টন আটা উত্তোলন করতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ এর একটি অংশ ট্রাকে করে নিয়ে বিক্রি করেন এবং বাকি অংশ গুদামকেন্দ্রিক একটি চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। এমনকি কিছু জনপ্রতিনিধিও ওই চক্রের মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহীতে নিম্নমানের চাল ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন

রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন খাদ্যগুদাম নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বাগমারায় নিম্নমানের চাল মজুতের ঘটনায় ভবানীগঞ্জ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাচ্চু মিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

মোহনপুরে নিজস্ব লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও অন্য একটি মিলের লাইসেন্স ব্যবহার করে ৪২০ টন ধান থেকে চাল তৈরি ও সরবরাহের অভিযোগের কথাও জানা গেছে। অন্যদিকে দুর্গাপুরে ৮০ টন খাওয়ার অনুপযোগী চাল শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

বাগমারা-ভবানীগঞ্জের ঘটনাসহ এসব অনিয়মের বিষয়ে আটটি তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য পাওয়া গেলেও সেসব তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খুলনায় ওজন ও বস্তা নিয়ে অভিযোগ

খুলনার সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতেও সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়মে সহযোগিতা করছেন।

ফলে ধান-চালের মান, বস্তার ব্যবহার এবং ওজন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি সংগ্রহে নতুন বস্তা ব্যবহারের নির্দেশ থাকলেও খুলনা শহরের মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদাম থেকে ধান-চাল সরবরাহের সময় পুরোনো, ছেঁড়া বা নিম্নমানের বস্তা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি বস্তায় এভাবে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। খুলনা সদর খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির বস্তায় ৪৯ থেকে ৪৯ দশমিক ৫ কেজি চাল দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

এ ছাড়া গুদাম, তল্লাশি ফাঁড়ি ও ওয়ে ব্রিজে ট্রাকের ওজন নেওয়ার সময়ও সিন্ডিকেটকে অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওএমএসের বরাদ্দ করা চাল গুদাম থেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

রংপুরে মিলার সিন্ডিকেটের অভিযোগ

রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সরকারি খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহের সুযোগ থেকে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।

তাঁদের দাবি, দালাল-ফড়িয়া ও মিলারদের একটি চক্র সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। চুক্তিবদ্ধ মিলারদের বড় একটি অংশের নিজস্ব মিল বা চাতাল না থাকলেও তাঁদের সঙ্গে সরকারি ধান-চাল সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রংপুরের কাউনিয়া ও মিঠাপুকুরে খোঁজ নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এমন চাতাল এবং নিজস্ব মিল-চাতাল না থাকা ব্যক্তিদেরও সরবরাহকারীর তালিকায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ নিজেদের নামে বরাদ্দ করা তালিকা অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। আর দালাল-ফড়িয়ারা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে সরকারি গুদামে সরবরাহ করে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে লাভ করছেন।

টিআইবি বলছে, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় শৃঙ্খলা জরুরি

এসব অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের খাদ্য সরবরাহ ও বিপণনব্যবস্থায় দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে খাদ্য সংগ্রহ, বিতরণ ও বিপণনের বিভিন্ন ধাপে সক্রিয় সিন্ডিকেট থাকার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ কখনো হাতবদল হয়, আবার কখনো ঘুষ বা উৎকোচের বিনিময়ে তারা বিভিন্ন সরকারের সময়ই টিকে থাকে।

তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে সরকারি পর্যায়ে খাদ্য মজুত ও বিপণনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রকৃত কৃষকের কাছে সুবিধা পৌঁছানোই চ্যালেঞ্জ

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কেনা এবং একই সঙ্গে সরকারি খাদ্য মজুত নিশ্চিত করা। কিন্তু দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলারনির্ভর চক্র সক্রিয় থাকলে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তাই প্রকৃত কৃষকের পরিচয় যাচাই, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ, মিলারদের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাই, গুদাম পর্যায়ে নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ - অপরাধ