দেশজুড়ে হাই-টেক পার্ক, আইটি পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক ও আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টারের মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণে বিগত সরকারের আমলে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৮ হাজার ১২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বিপুল অর্থ ব্যয় করে এসব অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন গড়ে ওঠেনি।
অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ এবং দুর্বল পরিকল্পনার কারণে অনেক প্রযুক্তি পার্ক কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি। পরিস্থিতি পরিবর্তনে এসব পার্ক নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে একটি মাস্টারপ্ল্যান।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে কোন পার্ক বাস্তবিক অর্থে কাজে লাগানোর উপযোগী এবং কোনগুলো অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়, তা মূল্যায়ন করা হবে। সম্ভাবনাহীন প্রকল্পে নতুন করে বিনিয়োগ বন্ধ করার পাশাপাশি সম্ভাবনাময় পার্কগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করা হবে।
৮১২৩ কোটি টাকার অবকাঠামো
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনটি হাই-টেক পার্ক—গাজীপুরের কালিয়াকৈর, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও রাজশাহী এবং তিনটি সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক—ঢাকার কারওয়ান বাজার, যশোর সদর ও চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া ১২টি জেলায় আইটি পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামের চারটি প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে জামালপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ এবং নাটোরের সিংড়ায় আটটি আইটি পার্কের নির্মাণকাজ চলছে।
পাশাপাশি ৩৪টি আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এসব হাই-টেক পার্ক, আইটি পার্ক, সফটওয়্যার পার্ক ও ট্রেনিং সেন্টারের মৌলিক অবকাঠামো নির্মাণে মোট ৮ হাজার ১২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা তখন পুরোপুরি সফল হয়নি। বর্তমানে এগুলোকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘সিলিকন ভ্যালি’ হওয়ার স্বপ্ন
রাজধানীর কাছাকাছি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩৩৫ একর জমির ওপর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি গড়ে তোলা হয়। এরপর যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, রাজশাহীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক ও শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার এবং সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্কসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রকল্পগুলো নেওয়ার সময় বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। এমনকি এসব পার্ক ভবিষ্যতে ‘সিলিকন ভ্যালি’র মতো প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাও ছিল।
তবে বাস্তবে অনেক প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণের পরও প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান গড়ে ওঠেনি।
শ্বেতপত্রে অনিয়মের চিত্র
আইসিটি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগে বিগত সরকারের সময়ে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত ও গবেষণার পর একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এর গবেষণা প্রতিবেদনে প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিবর্তে নির্মাণকাজই প্রকল্পের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। বাজেট বৃদ্ধি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পের স্থান নির্বাচন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অনিয়মের মতো অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রকল্পের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল সম্ভাব্যতা যাচাই ও স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার যথাযথ মূল্যায়ন না করে প্রকল্প গ্রহণ করা।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকায় পার্ক নির্মাণের প্রশ্ন
শনিবার ‘হাই-টেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আলোচকদের মতে, বিদ্যমান ইপিজেড, শিল্পাঞ্চল বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় না করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকাতেও অনেক হাই-টেক পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। ফলে অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক পরিবেশ ও প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠেনি।
তাঁদের মতে, শুধু ভবন ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রযুক্তি বিনিয়োগ আসে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তাদের সহায়তা, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ এবং শক্তিশালী স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিবেশ।
এবার অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষতায় নজর
সরকার এখন শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান পার্কগুলোকে কার্যকর করার দিকে গুরুত্ব দিতে চায়। এর আওতায় দক্ষ জনবল তৈরি, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল অর্থে নির্মিত এসব অবকাঠামোকে কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে হলে প্রকল্পভিত্তিক চিন্তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কোন ধরনের প্রযুক্তি শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে দক্ষ কর্মীর প্রাপ্যতা কেমন এবং বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ কতটা—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।


















