১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠের রাজনীতিতে আসা সাময়িক ভাটা কাটাতে এবং নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যক্রমে পুরোদমে সক্রিয় করতে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলের মূল লক্ষ্য হলো—আগামী স্থানীয় সরকার ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন করা, তৃণমূল থেকে সব কমিটি চাঙ্গা করা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দলের ‘সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল’ সম্পন্ন করা। এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই দলের দায়িত্বশীল নেতাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষে তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু করার জোর প্রস্তুতি চলছে। দলের হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পকেট কমিটি বা সিলেকশন নয়, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কাউন্সিলের (ভোটের) মাধ্যমেই নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
তারেক রহমানের ম্যারাথন বৈঠক ও বিতর্কহীন কমিটি গঠনের কঠোর বার্তা
সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দলের সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত করতে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। গত শনিবার গুলশান কার্যালয়ে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, ঢাকা জেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে সিরিজ বৈঠক করেন।
- ঢাকা জেলা বিএনপি: নিপুণ রায়ের নেতৃত্বে জেলার শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে জেলা-থানা ও তৃণমূল পর্যায়ে জনসংযোগ বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
- স্বেচ্ছাসেবক দল: সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহমদ, সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী ও সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসানের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান সারা দেশের কমিটির বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করেন। যুবদল বাদে বিএনপির বাকি ১০টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনই বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ। প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন ও গতিশীল নেতৃত্ব আনা হবে। তবে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন কমিটি গঠনে যেন কোনোভাবেই কোনো আর্থিক অনিয়ম বা বিতর্কের জন্ম না হয়।
- ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি: দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী। সামনে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থাকায় মহানগর দক্ষিণের থানা ও ওয়ার্ডগুলোর দুর্বল কমিটিগুলোতে দ্রুত গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমান নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, এখন থেকে তিনি সরকারের পাশাপাশি দলীয় সংগঠনের সার্বিক উন্নয়নে নিয়মিত সময় দেবেন।
দীর্ঘ এক দশক পর জাতীয় কাউন্সিলের আবহ
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়ন ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চের (৬ষ্ঠ কাউন্সিল) পর আর কোনো কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান এবং তাঁর নেতৃত্বেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। দীর্ঘ সময় পর দল এখন ক্ষমতায় থাকায় সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়ার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই পুনর্গঠন নিয়ে বলেন, “জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে এখনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ না হলেও দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং যা কিছু হবে, তা কাউন্সিলের মাধ্যমেই হবে।” অন্যদিকে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরু থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভাঙা শুরু হবে। সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সেবার সঙ্গে জনগণের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করাই এখন নেতাকর্মীদের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।


















