জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব এখন দেশের প্রতিটি সেক্টরে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, লোডশেডিং এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবাই এখন চরম বিপাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির এই বাড়তি দাম কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পুরো অর্থনীতিতে একটি শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া (Chain Reaction) সৃষ্টি করেছে। এর ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি ও সেবা খাতের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
বাজারে আগুনের উত্তাপ জ্বালানির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও পিকআপ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে সবজি, মাছ ও মাংসের দাম এখন আকাশচুম্বী। মিরপুরসহ বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি এখন ৬০ থেকে ১৩০ টাকার ঘরে বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি ও সোনালির দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনতেই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বিক্রয়মূল্যে।
পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা ও বাড়তি ভাড়া সরকার আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করলেও বাস্তবে টার্মিনালগুলোতে চলছে ভাড়ার নৈরাজ্য। গাবতলীসহ বিভিন্ন বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে টিকিট প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায় করা হচ্ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব এবং বাস মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে যাত্রীরা এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটেও লোকাল বাসগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত খরচকে অসহনীয় করে তুলেছে।
কৃষি ও শিল্পে অশনি সংকেত জ্বালানির এই উচ্চমূল্য দেশের কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিপিডির মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে খরচ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।


















