ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে চলা ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল, ২০২৬) দুই দেশের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী কড়া বক্তব্য এসেছে। হোয়াইট হাউস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরানের জন্য কিছু ‘অপরিবর্তনীয়’ শর্ত নির্ধারণ করেছিল, যা থেকে একচুলও নড়বে না ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, ইরান এই শর্তগুলোকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে মার্কিন নৌ-অবরোধের হুমকিকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সেই কঠোর শর্তগুলো এবং বর্তমান পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট নিচে তুলে ধরা হলো:
১. যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৫টি ‘অপরিবর্তনীয়’ শর্ত
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তান ত্যাগের আগে জানিয়েছেন, এটিই ছিল তাদের পক্ষ থেকে ‘সেরা ও শেষ প্রস্তাব’ (Best and Final Offer)। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্তগুলো ছিল:
- ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ: ইরানকে সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
- পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস: ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে হবে।
- জ্বালানি হস্তান্তর: মাটির নিচে মজুত রাখা প্রায় ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
- আঞ্চলিক সহায়তা বন্ধ: হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের সব ধরনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।
- হরমুজ প্রণালি: এই কৌশলগত জলপথটি সম্পূর্ণ খুলে দিতে হবে এবং জাহাজ যাতায়াতে কোনো শুল্ক নেওয়া যাবে না।
২. ইরানের অবস্থান: ‘আপনারা লড়লে আমরাও লড়ব’
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবগুলোকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ আজ এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন:
- হুমকি মোকাবিলা: হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের নৌ-অবরোধের হুমকি ইরানিদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
- পাল্টা হুঁশিয়ারি: গালিবাফ সরাসরি বলেন, “আপনারা যদি লড়াই করেন, আমরাও লড়াই করব। আর যদি যুক্তি নিয়ে আসেন, তবে আমরাও যুক্তি দিয়েই তার মোকাবিলা করব।”
- কৌশলগত অবস্থান: ইরান মনে করছে, হরমুজ প্রণালি যেহেতু এখনো কার্যত তাদের নিয়ন্ত্রণে, তাই আলোচনার টেবিলে তাদের পাল্লাই ভারী।
৩. ট্রাম্পের ‘নৌ-অবরোধ’ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, যুদ্ধের পর ইরান বর্তমানে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এই সুযোগে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে তাদের নতিস্বীকার করাতে চান তিনি। এর অংশ হিসেবেই তিনি হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্ত অবস্থান বা ‘নৌ-অবরোধ’ (Naval Blockade)-এর ঘোষণা দিয়েছেন।
৪. বিশ্লেষকদের মত: কেন এই ব্যর্থতা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের অবস্থান ছিল মেরুপ্রুভ।
- যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব: ওয়াশিংটন মনে করেছিল যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরান দ্রুত সব শর্ত মেনে নেবে।
- ইরানের অনড় মনোভাব: ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান তাদের পারমাণবিক ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে আপস করতে রাজি হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি: ২২ এপ্রিলের কাউন্টডাউন
ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ায় এখন সবার নজর আগামী ২২ এপ্রিল-এর দিকে। কারণ, ওই দিনই বর্তমান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। যদি এর মধ্যে নতুন কোনো কূটনৈতিক জানালা না খোলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
একদিকে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধের দামামা—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব।



















