২০১৯ সাল থেকে প্রচলিত লটারি প্রথা বাতিল করে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও ভর্তি পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১৬ মার্চ মাউশির এই আদেশের পর থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশে নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ভর্তি কোচিং ব্যবসা। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়ছে মানসিক চাপ, আর অভিভাবকদের পকেট কাটছে নামিদামি কোচিং সেন্টারগুলো।
ভর্তি পরীক্ষা কেন্দ্রিক বর্তমান পরিস্থিতির মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কোচিং সেন্টারের চটকদার বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্য
লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণার পরপরই রাজধানীর অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ভর্তি কোচিং সেন্টার।
- আকর্ষণীয় অফার: সেন্ট যোসেফ বা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের মতো স্কুলে ভর্তির গ্যারান্টি দিয়ে লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
- উচ্চমূল্যের কোর্স ফি: ‘জিনিয়াস কোচিং সেন্টার’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি কোচিংয়ের জন্য এককালীন ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করেছে।
- ভর্তি গাইড: বাজারে বিভিন্ন প্রকাশনীর ভর্তি গাইডের কাটতি হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গেছে।
২. শিক্ষার্থীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ
ভর্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক একাডেমিক পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুল কমিয়ে দিয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় দিতে বাধ্য করছেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির একজন শিশুর ওপর এই ‘ভর্তিযুদ্ধ’ চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩. শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের উদ্বেগ
লটারি প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্তে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
- অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক মনে করেন, লটারি পদ্ধতিই ছিল অধিকতর ন্যায়সঙ্গত। পরীক্ষা চালুর ফলে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা সুবিধা পাবে এবং গরিবের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে, যা শিক্ষায় চরম বৈষম্য তৈরি করবে।
- অভিভাবক ঐক্য ফোরাম: ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু প্রশ্ন তুলেছেন, কাদের স্বার্থে তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? তাঁর মতে, এতে ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
- জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলন: সংগঠনটি মনে করে, লটারি বাতিলের ফলে স্কুলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং সিট বাণিজ্য আবারও ফিরে আসবে।
৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বনাম দেশীয় বাস্তবতা
শিক্ষাবিদদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না। সেখানে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশে সব স্কুলের মান সমান না হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট কিছু ‘এলিট স্কুল’-এর প্রতি ঝোঁক থাকায় এই কোচিং কালচার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিগত সরকারের আমলে কোচিং বাণিজ্য ও ভর্তি জালিয়াতি ঠেকাতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।



















