ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করতে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে মার্কিন সিনেটে একটি ঐতিহাসিক বিল (যুদ্ধসংক্রান্ত প্রস্তাব) পাস হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) মার্কিন উচ্চকক্ষ সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটের ব্যবধানে এই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে এটি মার্কিন নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) পাস হয়েছিল। মার্কিন ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সফলভাবে পাস হলো। এটি মূলত একটি ‘কনকারেন্ট রেজোলিউশন’ বা যৌথ প্রস্তাব হওয়ায় তা কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না, তবে ট্রাম্প প্রশাসন এর আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় পদক্ষেপটিকে মূলত একটি প্রতীকী ও শক্তিশালী রাজনৈতিক চাবুক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
রিপাবলিকান শিবিরে ফাটল ও ভোটের সমীকরণ
বর্তমানে মার্কিন সিনেটে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও দলটির চারজন রক্ষণশীল সিনেটর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই বিলের পক্ষে ভোট দেন। তাঁরা হলেন—লুইসিয়ানার বিল কাসিডি, আলাস্কার লিসা মুরকোস্কি, মেইনের সুসান কলিন্স এবং কেনটাকির র্যান্ড পল। অন্যদিকে ডেমোক্রেট শিবিরের পেনসিলভেনিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান বাদে বাকি সব সদস্য এই বিলের পক্ষে সমর্থন জানান। এছাড়া রিপাবলিকান দলের মিচ ম্যাককনেল (যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন) এবং ডেভ ম্যাককরমিক নামের দুই সিনেটর এই ভোটদানে অনুপস্থিত ছিলেন, যা মূলত ডেমোক্রেটদের এই বিলটি পাস করতে সহজ সুযোগ করে দেয়।
ট্রাম্পের ইরান নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা
বিলটি পাসের পর সিনেটের ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত আমেরিকান জনগণের জন্য কেবল সর্বোচ্চ বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষতিই বয়ে এনেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক ভুলের জন্য মার্কিন জনগণকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে এবং এটি আমেরিকার অন্যতম নিকৃষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট সদস্য গ্রেগরি মিকস এক বিবৃতিতে জানান, কয়েক মাস ধরে চলা এই অবৈধ যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় এবং ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়া ছাড়া কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি।
বিলের মূল ধারা ও যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনমত
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হওয়া এই যুদ্ধসংক্রান্ত প্রস্তাবে মূলত ইরানের বিরুদ্ধে যাবতীয় শত্রুতা ও সামরিক অভিযান বন্ধ করে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি জরুরি সুরক্ষাকবচ রাখা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর কোনো ‘আসন্ন হামলা’ প্রতিরোধের জন্য সীমিত পরিসরে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা যাবে। এই বিলের বিরোধিতা করে আইডাহোর রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ যুক্তি দেন, সুইজারল্যান্ডে যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মাধ্যমে ইরানের সাথে একটি স্থায়ী চুক্তির আলোচনা চলছে, তখন এই প্রস্তাব পাস ট্রাম্পের অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে। তবে মার্কিন সাধারণ জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা একেবারেই তলানিতে। মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্স এবং ইপসোসের যৌথ এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৪ শতাংশ আমেরিকান নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই যুদ্ধকে যৌক্তিক বা সমর্থনযোগ্য মনে করছেন।
সূত্র: আলজাজিরা


















