ভারত বিএনপির প্রতি ঝুঁকছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে—এই বাস্তব ধারণা থেকেই ভারত এখন দলটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এ মুহূর্তে ভারতের হাতে অন্য কোনো অপশনও নেই। বিএনপিই এখন ভারতের নম্বর ওয়ান অপশন।”
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আগামী দিনে বাংলাদেশে যে নেতৃত্ব আসবে বলে ভারত আশা করছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়তে চায় দিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় সফরের সময় সেই সম্পর্ক গড়ার বার্তাও দিয়ে গেছেন।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়েও ভারতের গভীর নজর রয়েছে বলে জানান মুন্সী ফয়েজ। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীতে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জনসমর্থন ভারতের কূটনৈতিক মহলেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিকরাও। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারেক রহমান যেভাবে দলীয় সমর্থনকে সুসংহত করেছেন, তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। তিনি মনে করেন, বিভক্ত ও সহিংসতায় আক্রান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান মধ্যপন্থী শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে সক্ষম হতে পারেন।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমান এখন “সব সঠিক কথাই বলছেন।” ঢাকায় তাঁর সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ এবং তিনি এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে পারেন বলেও মত দেন তিনি।
দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ভারতের সঙ্গে সরকারিভাবে যোগাযোগ ছিল মূলত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সঙ্গেই। বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সীমিত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এটিই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের প্রথম আনুষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক।
ওই বৈঠক সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কীভাবে আরও গভীর ও দৃঢ় করা যায়, সে বিষয়েই মূলত আলোচনা হয়েছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো ভারতের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে ভারতের তৎপরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তা পাঠান, যা ঢাকায় পৌঁছে দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। সে সময় তারেক রহমানের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও ঢাকায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি তাঁর সেই আদর্শকে এগিয়ে নেবে এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ করবে।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে বিএনপি যে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিএনপির কূটনীতির মূলনীতি একটাই—“সবার আগে বাংলাদেশ।” দেশের জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখেই সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালিত হবে।
ভারত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “আমি অবশ্যই আমার দেশের পানির ন্যায্য হিস্যা চাই। আমি আরেকজন ফেলানীকে ঝুলতে দেখতে চাই না। ভারত যদি স্বৈরাচারকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হয়, সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমাকে আমার দেশের মানুষের সঙ্গেই থাকতে হবে।”
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তন ও তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ভারত ধীরে ধীরে বিএনপিকেই ভবিষ্যতের প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।



















