বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের স্থবিরতা, ধীর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ Bangladesh Development Update অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দারিদ্র্য বেড়েছে এবং প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির পেছনে বিনিয়োগের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও কম রাজস্ব আহরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে এবং বেসরকারি খাতে আস্থা দুর্বল হয়েছে। সংস্থাটি ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে।
কমেছে বিনিয়োগ ও রপ্তানি
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানিও কমেছে। সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়েও চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতিতে শিল্প ও উৎপাদন খাত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে, কর্মঘণ্টা কমিয়েছে এবং কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশে নেমেছে। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদনও সংকুচিত হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা থাকায় কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা দেখা দিলে সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাড়ছে দারিদ্র্য, চাপে মানুষের জীবনযাত্রা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি কয়েক বছর ধরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছিল, যা ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি। সর্বশেষ আপডেটেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, গত অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি থেমে গেছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়েও বেশি।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন পরিস্থিতিও দুর্বল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়, যেখানে নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম মান ইতিবাচক থাকার কথা।
এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন। বেসরকারি ঋণের গতি কমে গেলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও তার প্রভাব পড়ে।
রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতা
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাকে অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে ছিল, যা বিশ্বে অন্যতম নিম্ন হার। এর ফলে একই অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে।
কম রাজস্বের কারণে সরকার সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার সংকট
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসার খরচ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলো কাজে লাগানো এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নীতি ও কৌশলে সংস্কার প্রয়োজন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, রাজনৈতিক সরকার আসার পর বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থা বাড়ার প্রত্যাশা থাকলেও এখনো তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, প্রশাসনিক সংস্কার, সরকারি সেবার মান বাড়ানো এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ ও বন্দরসেবার মান উন্নত করা প্রয়োজন।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগেও চাপ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও দুর্বল রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এফডিআই ১৫ শতাংশ কমে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যবসার পরিবেশে নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা কমানো, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
রেমিট্যান্সে কিছুটা স্বস্তি
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে চাপ থাকলেও রেমিট্যান্স প্রবাহকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে এবং বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছে।
সংস্কারই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ
বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংস্কার এগিয়ে নেওয়া গেলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে নিতে এখন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতকে পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।


















