ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালকে ঘিরে দালালচক্র ও আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মিটফোর্ড হাসপাতালের আশপাশে অল্প দূরত্বের মধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। কোতোয়ালি ও চকবাজার এলাকাতেও রয়েছে আরও বহু প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই। কোথাও কোথাও মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসকদের নাম ও পরিচয় প্রচারসামগ্রীতে ব্যবহার করে রোগীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দালালের মাধ্যমে রোগী নেওয়ার অভিযোগ
রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দূর-দূরান্তের রোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায় দালালরা। দ্রুত চিকিৎসা, কম খরচে বিশেষজ্ঞ দেখানো কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধার কথা বলে তাঁদের বাইরে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
মুন্সীগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মজিদ এমনই একটি ঘটনার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, পিত্তথলিতে পাথর ও তলপেটের ব্যথার চিকিৎসার জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে আসার পর কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে বাইরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান।
সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরীক্ষা করানোর পরও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পাওয়ার দাবি করে মজিদ বলেন, তাঁর কাছে থাকা অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফেরার টাকাও ছিল না।
অফিস সময়ে চিকিৎসকদের বাইরে রোগী দেখার অভিযোগ
সরেজমিনে বেলা ১টা ২০ মিনিটের দিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের বহির্বিভাগের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক তানভীরকে হাসপাতালের পাশের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শিশু বিভাগ ও মেডিসিন বিভাগের কয়েকজন চিকিৎসককেও ওই ক্লিনিকে যেতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব চিকিৎসক নির্ধারিত কর্মঘণ্টায় দায়িত্বে ছিলেন কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতা ও নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অফিস সময়ে সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালন না করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখা আইন ও বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাঁর দাবি, এ ধরনের অনিয়মের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
চুরি নিয়েও অভিযোগ
দালালচক্রের পাশাপাশি মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় নিয়মিত চুরির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চোরেরা অনেক সময় রোগীর স্বজনের পরিচয় দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ এইচ এম এ রুস্তম বলেন, কর্মঘণ্টায় কোনো চিকিৎসক বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলে তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দালাল ও চুরি প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে জানিয়ে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, অভিযানে চোরদের আটক করে পুলিশে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
মিটফোর্ড হাসপাতাল রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে এখানে আসেন। ফলে হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি আশপাশের বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান, দালালচক্র এবং চিকিৎসকদের কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে পালনের বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।


















