গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট যেন কোনোভাবেই কাটছে না। দিনের বড় একটি সময় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ থাকছে না, আবার রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যানও ঘুরছে না। শিল্পকারখানায় কমছে উৎপাদন, কোথাও কোথাও বন্ধ থাকছে মেশিনের চাকা। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে চাপ।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের বহুমুখী প্রভাব পড়ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর। কমছে আয়, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও জনদুর্ভোগ। পরিস্থিতিতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সংকট নিয়ে সংসদের বাইরেও সরব হয়েছে বিরোধী দল। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে সরকারও পরিস্থিতি নিয়ে অস্বস্তির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান সংকট তাদের তৈরি নয়; বরং তারা এটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ নতুন নয়। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট এবার ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বড় ঘাটতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে ঘাটতি থাকছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট।
তবে বাস্তবে অনেক এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টি জ্বালানি সংকটে রয়েছে বলে পিডিবির তথ্যে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তেলভিত্তিক এবং দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম
গ্যাসের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক সরবরাহ কমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। আমদানি করা এলএনজি থেকে যোগ হচ্ছে আরও প্রায় ১ হাজার এমএমসিএফডি।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। ঘাটতি পূরণে বেশি করে তেল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে সরকারকে। এসব কেন্দ্র পরিচালনার ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নানা অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সমস্যা।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের সীমিত সরবরাহের মধ্যেও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রতিবছর কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে বাড়ছে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা। সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর সঙ্গে রয়েছে ডলার সংকট। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। তখন আমদানির পরিমাণ কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের গ্যাস সরবরাহে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা দেশের জন্য বড় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে পড়েছে। তার মতে, এ সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই এবং পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং আদানি গ্রুপ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে সংকটকে তীব্র করেছে।
অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, সরকার সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। কুইক রেন্টাল কেন্দ্র সচল করার পাশাপাশি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
শিল্পে গ্যাস দেওয়ার পরামর্শ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি কঠিন আকার ধারণ করেছে। স্বল্পমেয়াদে আবাসিক খাতের তুলনায় শিল্প খাতে বেশি গ্যাস দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ওপরও জোর দেন তিনি। তার মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধরনের ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজি আমদানির কথা বললেও দেশের সীমিত আমদানি সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন তিনি। ডলার সংকটের কারণে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানি করাও সহজ নয় বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান?
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বিদ্যমান সংকট দ্রুত সমাধান করা কঠিন। সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নেও ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাস্তবে অনেক জায়গায় তা মানা হচ্ছে না এবং যথাযথ নজরদারিও নেই।
তার মতে, সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল করা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সহজ সমাধান নেই
সব মিলিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট শুধু নাগরিক ভোগান্তি বাড়াচ্ছে না, বরং শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে সংকট সামাল দিতে জ্বালানি সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সংকট রাতারাতি তৈরি না হওয়ায় এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতা মেনে নিয়ে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

















