দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানেই ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম। কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও পর্যাপ্ত সহকারী শিক্ষক নেই। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদ ৬৫ হাজার ৫০২টি এবং সহকারী শিক্ষক পদ ৩ লাখ ৬৪ হাজার ২৯টি। সব মিলিয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৩১টি।
এর বিপরীতে গত রোববার পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৬ জন। ফলে মোট ৫৬ হাজার ৩৯৫টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে, যা অনুমোদিত পদের প্রায় ১৩ শতাংশ।
এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদেই শূন্য রয়েছে ৩৬ হাজার ২৩৫টি, যা অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদের ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য ছিল ৩৪ হাজার ১০৬টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পদ বেড়েছে আরও ২ হাজার ১২৯টি। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক পদও ২০ হাজারের বেশি শূন্য রয়েছে।
দুই শিক্ষকেই চলছে পুরো বিদ্যালয়
শিক্ষক সংকটের প্রকট চিত্র দেখা গেছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি হলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন।
তাদের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি তাকেই নিয়মিত পাঠদান করতে হচ্ছে। দুই শিক্ষককে পাঁচটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে গিয়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে বসিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে গেলে কার্যত পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন জানান, বিদ্যালয়টিতে ডেপুটেশনে শিক্ষক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিক্ষক পাওয়া যায়নি।
এক বছরে ময়মনসিংহে কমেছে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী
শিক্ষক সংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী উপস্থিতিতেও। ময়মনসিংহের ২ হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৪২টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে ৮৫৩টি।
এদিকে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী কমেছে গফরগাঁও উপজেলায়।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আবার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষার মান সন্তোষজনক নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সারাদেশেই প্রধান শিক্ষক সংকট
বিভিন্ন জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই প্রধান শিক্ষক পদে বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে।
বগুড়ায় ৮০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। খুলনায় ১ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতে, গাজীপুরের ৭৭৬টির মধ্যে ২৯৩টিতে, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টির মধ্যে ৩৪৩টিতে, ফরিদপুরের ৮৮৮টির মধ্যে ৫১৫টিতে এবং রাজবাড়ীর ৪৮১টির মধ্যে ২৭৯টিতে প্রধান শিক্ষক নেই।
এ ছাড়া বান্দরবানের ৪৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭৪টি, রাজশাহীর ১ হাজার ৫৭টির মধ্যে ৫৮৯টি এবং রংপুরের ১ হাজার ৪৫৫টির মধ্যে ৬৬৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এ বিভাগে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি।
থমকে গেছে বৃত্তি ও সহশিক্ষা কার্যক্রম
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে অনেক বিদ্যালয় ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় কয়েকটি বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও নিয়মিত হচ্ছে না বলে জানা গেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিতে ৮০ শতাংশ কোটা থাকলেও শিবপুরের কয়েকটি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন জানান, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।
অক্টোবরে যোগ দেবেন ১৪ হাজার ৩৮৪ সহকারী শিক্ষক
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা সহকারী শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। মাঠপর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য সফটওয়্যারে সংযুক্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ ও আপত্তি নিষ্পত্তির পর তালিকা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে পাঠানো হবে।
এদিকে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর তাদের যোগদানের কথা রয়েছে। নতুন শিক্ষকদের পদায়নের পর সহকারী শিক্ষক পদে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দ্রুত নিয়োগের আশ্বাস সরকারের
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩২ হাজার পদ একটি মামলার কারণে আটকে ছিল।
গত জুলাইয়ে পদোন্নতিসংক্রান্ত আইনি জটিলতা দূর হওয়ায় এখন দ্রুত শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারি কর্ম কমিশনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানানোর আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কয়েক বছর আগে কিছু শিক্ষককে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষক করা হলেও তাদের পদোন্নতি হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসর নিয়েছেন, আবার অনেকে মারা গেছেন।
নতুন শিক্ষক না আসা পর্যন্ত বদলি স্থগিত
নতুন নিয়োগ পাওয়া ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের পদায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম স্থগিত করেছে সরকার।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, নতুন শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদায়নের সুবিধার্থে আপাতত সব ধরনের বদলি স্থগিত রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষকদের পদায়ন শেষ হলে আবার বদলি কার্যক্রম চালু করা হবে। তবে তখন বর্তমান নীতিমালায় বদলি হবে, নাকি নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করা হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের তাগিদ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক পর্যায়েই। তাই এ স্তরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না; শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন এবং তাদের উপযুক্তভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারেন—এমন মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়নের ব্যবস্থাও জরুরি।
প্রাথমিক শিক্ষার এই শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার এবং শিক্ষার মান—তিন ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


















