দেশব্যাপী সাম্প্রতিক অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যা পরিস্থিতিতে সরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার (১১ জুলাই, ২০২৬) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই অবস্থান ও বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি স্পষ্ট জানান, জনগণের নির্বাচিত এই সরকার সর্বোচ্চ মমত্ববোধ নিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের সুরক্ষায় কাজ করছে এবং সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতার মাধ্যমে দ্রুতই মাঠপর্যায়ে স্বস্তি ফিরে আসবে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা ও শাহাদত হোসেন স্বাধীনসহ সহকারী প্রেস সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের ৫ জেলায় মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ তৎপরতা
মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের মূলত পাঁচটি জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জনমানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সার্বক্ষণিকভাবে এই পরিস্থিতি নিজে এবং তাঁর বিশেষ টিম মেম্বারদের মাধ্যমে মনিটরিং করছেন। দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনায় এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দুর্গতদের সহায়তায় গৃহীত মূল পদক্ষেপসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
- বৈঠক ও প্রশাসনিক তদারকি: গত শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি, এসপি, ইউএনও, সিভিল সার্জন ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজ রবিবারও দেশের সব বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর আলোচনার কথা রয়েছে।
- আর্থিক অনুদান ও আশ্রয়কেন্দ্র: জরুরি ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ২ কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক অনুদান ছাড় করা হয়েছে। বর্তমানে সচল থাকা ১ হাজারেরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
- মাঠপর্যায়ে তদারকি ও রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে বর্তমানে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দলের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে উদ্ধার কাজে নামার নির্দেশ দেওয়ায় নেতাকর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ত্রাণ বণ্টন করছেন। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহস্থালি, কৃষি, মৎস্য ও গবাদি পশু খামারিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি দ্রুত ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের মানবিক হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৭০ হাজার কোটি টাকা
বন্যা পরিস্থিতির তদারকির পাশাপাশি গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) ঐতিহাসিক ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক এই উন্মুক্ত আলোচনায় তিনি দেশের চিকিৎসকদের আরও বেশি মানবিক হওয়ার এবং রোগীর আস্থা অর্জনের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধার্মিণী ও ঢামেকের ৪৩তম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি চালিয়ে তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে দীর্ঘ বছর পর এই ক্যাম্পাসে আসেন এবং কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেলে গিয়ে ছাত্রীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন, যা ক্যাম্পাস জুড়ে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করে।
| স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান চিত্র ও লক্ষ্য (২০২৬) | প্রধানমন্ত্রীর মূল বক্তব্য ও পরিকল্পনা |
| বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় | বিদেশে চিকিৎসার কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশে ধরে রাখতে হবে। |
| বাজেট ও জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা | চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ৫ বছরে জিডিপির ৫% করা হবে। |
| ঐতিহাসিক অবদান | ঢামেক ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের সাক্ষী। |
প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের মহৎ পেশার কথা স্মরণ করে বলেন, মানুষ সম্পূর্ণ বিপদে পড়েই চিকিৎসকদের ভরসার আশ্রয়স্থল মনে করে। তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করে জানান, কীভাবে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসকেরা তাঁর মা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া)-কে বছরের পর বছর ধরে দিন-রাত পরম যত্নে চিকিৎসা দিয়েছেন। তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তির জন্য হয়তো মানুষ বিদেশে যায়, কিন্তু দেশের চিকিৎসকেরা চব্বিশটি ঘণ্টা রোগীর যে ‘হিউম্যান টেককেয়ার’ বা মানবিক সেবা দেন, তা বিশ্বের কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার ওপর জোর দিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন। ঢামেকের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


















