বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বি-পাক্ষিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে এক বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এখন আর আগের মতো একতরফা বাণিজ্য সুবিধা বা কেবল অনুদান-নির্ভর সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্য, সরাসরি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ সমতাভিত্তিক ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। গতকাল রাজধানীর শেরাটন হোটেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী (কোয়াটারসেন্টেনিয়াল) উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ যৌথ অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস এবং আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) যৌথভাবে বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অঙ্গনে একাকী চলবে; বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য সমান বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করতে তাঁর দেশ একটি প্রকৃত অংশীদারি (পার্টনারশিপ) গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগরি দক্ষতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ার তাগিদ ও নতুন খাতের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের গতিশীল বেসরকারি খাত এবং অফুরন্ত তরুণ জনশক্তির ভূয়সী প্রশংসা করে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, এই বিপুল সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার সব যোগ্যতা রাখে। তবে দেশের এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে যদি পুরোপুরি ও সফলভাবে কাজে লাগাতে হয়, তবে অতি দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, দুর্নীতি কঠোর হস্তে মোকাবিলা, মুক্ত প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের আরও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খাতের অংশীদারিত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও জানান, চিরাচরিত খাতের বাইরেও আগামীতে উচ্চপ্রযুক্তি (হাই-টেক), দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা খাতে দুই দেশের যৌথভাবে কাজ করার এক নজিরবিহীন ও ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিনের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদি আমিন বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণ ‘ব্যবসাবান্ধব’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, নিয়ন্ত্রণমুক্ত মুক্ত-বাণিজ্য পরিবেশ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করার সুদৃঢ় আশ্বাস দেন তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে মাহদি আমিন বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠী এবং প্রসারিত অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার যেকোনো মার্কিন বিনিয়োগকারীর জন্যই একটি বড় আকর্ষণ। তিনি মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শতভাগ মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার আইনি সুযোগ, বিশেষ কর প্রণোদনা, সরকারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) এবং হাইটেক পার্কের অভাবনীয় সুবিধাগুলো নিজে এসে যাচাই করে বাংলাদেশে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
অ্যামচ্যামের তিন দশকের অবদান ও যৌথ সাফল্যের নতুন অধ্যায়
অর্থনৈতিক সম্পর্কের এই মাইলফলক মুহূর্তে অ্যামচ্যামের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এবং মার্কিন পুঁজি আকর্ষণে তাদের চেম্বার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অগ্রণী অবদান রেখে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, তৈরি পোশাক (আরএমজি), বিশ্বমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং এভিয়েশনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বড় খাতে মার্কিন বিনিয়োগ নিয়ে আসতে এবং জ্ঞান হস্তান্তরে অ্যামচ্যাম সর্বদা প্রথম যোগাযোগমাধ্যম (ফার্স্ট পয়েন্ট অব কন্টাক্ট) হিসেবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অ্যামচ্যামের নির্বাহী কমিটিতে মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক উপদেষ্টাকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে সম্পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক উদ্যোগ নিতে বড় ধরনের সহায়তা করবে।
সবশেষে, অ্যামচ্যামের সহসভাপতি মুহাম্মদ আলাউদ্দীন আহমাদ বলেন, একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক, আধুনিক ও ভবিষ্যৎমুখী বাংলাদেশ গড়তে তাদের সংগঠন দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের মূল সেতুবন্ধন হিসেবে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি অংশীদারি, পারস্পরিক গভীর বন্ধুত্ব ও যৌথ সাফল্যের এক নতুন ও সোনালী অধ্যায়ের দিকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।



















