দেশের বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপঞ্জি, উচ্চ ভর্তি ফি এবং জাতীয় সংস্কৃতিবিমুখ পাঠ্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সমন্বিত নীতিমালা চূড়ান্ত করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে সুনির্দিষ্ট আইনের অভাবকে কাজে লাগিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো চললেও, এখন থেকে শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের সরাসরি নজরদারির আওতায় আসতে হবে তাদের। গত রবিবার শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়, যেখানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
নতুন নীতিমালার উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ:
- শ্রেণি বিন্যাস ও নিবন্ধন: স্কুলগুলোকে শিক্ষার্থী সংখ্যা ও অবকাঠামোর ভিত্তিতে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭০ ভাগ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কোনো নিবন্ধন নেই। নতুন নীতিমালায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
- আর্থিক স্বচ্ছতা ও ফি নির্ধারণ: এখন থেকে টিউশন ফি, ভর্তি ফি এবং ছুটির ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করে দেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিটি স্কুলে নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটি গঠন করতে হবে, যারা প্রতিষ্ঠানের ব্যয়-বিবরণী তৈরি করবে এবং অর্থবছর শেষে অডিট রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেবে।
- দেশীয় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি: অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদেশি ইতিহাস জানলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর নাম জানে না। তাই নতুন নীতিমালায় বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় সংগীতের মতো বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
- তদারকি ও স্বচ্ছতা: প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ৯৯ ভাগ শিক্ষার্থীই বাংলাদেশি হলেও সরকারি তদারকি না থাকায় তারা জাতীয় পরিচয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। এমনকি ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত থেকে সেশন ফি বন্ধ এবং ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অধিকাংশ স্কুল তা মানছিল না। অনেক স্কুলে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের শিশুদের ওপর ১২ থেকে ১৪টি বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এবং ভর্তি ফি বাবদ ৫০ হাজার থেকে সাড় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, একই রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থাকা যুক্তিসঙ্গত নয়। কেমব্রিজ বা ব্রিটিশ কাউন্সিলের কারিকুলাম অনুসরণ করলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকতে হবে। এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে যেমন শিক্ষার খরচ কমবে, তেমনি জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে তাদের একটি যোগসূত্র তৈরি হবে।



















