গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে সরকার। এতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ। কিন্তু আমদানি ব্যয় বাড়লেও শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, আবার কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন চালানো বা রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একদিকে গ্যাস আমদানিতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। বাসাবাড়িতেও কমছে না ভোগান্তি।
এই পরিস্থিতিতে চড়া দামের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এতে আমদানি ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা এবং জরুরি মজুতের ঘাটতির কারণে আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিন মাসেই প্রায় এক বছরের ভর্তুকির সমান ব্যয়
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাস, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের এলএনজি কেনাতেই বরাদ্দকৃত ভর্তুকির কয়েক গুণ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
গত অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে আগের পুরো বছরের ভর্তুকির প্রায় ৭১ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ।
একই হারে ব্যয় চলতে থাকলে বছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানির পরিমাণ এবং চুক্তিভিত্তিক সরবরাহের ওপর বছরের মোট ব্যয় নির্ভর করবে।
চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রয়োজন উল্লেখ করে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে বলে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বছরের বাকি সময়ে এলএনজি আমদানির আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও আলোচনা করা হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম নিয়মিত ওঠানামা করে। যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দাম বেড়ে যায়। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও এর প্রভাব পড়ে দামে।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।
দাম বাড়লেও সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই
তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হয়। তবে এই বাজারে দাম দ্রুত ওঠানামা করে। যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সরবরাহে বাধা তৈরি হলে আমদানিকারক দেশগুলোকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির আগে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ ডলারে কিনত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই দাম বেড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে।
চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দাম পড়েছে প্রায় ২৭ থেকে ২৯ ডলার। একই সময়ে কিছু স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলার।
তবে ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত এবং দামের সূত্র ভিন্ন হওয়ায় সব কার্গোর ক্ষেত্রে একই ধরনের সাশ্রয় ধরে নেওয়া যায় না। কম দামের নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হতে পারে।
আবার এলএনজি দেশে পৌঁছানোর পরও টার্মিনালে কারিগরি বা পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিলে তা জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্পট মার্কেট থেকে কেনাকাটা কমানোর উদ্যোগ
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।
এ লক্ষ্যে বিশ্বের অপেক্ষাকৃত নির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে কোনো বড় সরবরাহকারী প্রতিশ্রুত কার্গো সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে আবারও চড়া দামের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে বর্তমানে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকলেও আগামী বছরের শুরুতেই ওই চুক্তির আওতায় আমদানি পুনরায় শুরু করা যাবে বলে আশাবাদী জ্বালানি বিভাগ।
পাশাপাশি নতুন এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াও চালু রেখেছে পেট্রোবাংলা। গত ২৯ আগস্ট সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত করা হয়েছে।
তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম ৫ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ থাকতে হবে। একক প্রতিষ্ঠান বা যৌথ উদ্যোগে আবেদন করা যাবে। আগে থেকে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না।
গ্যাস সংকটে কমছে শিল্পের উৎপাদন
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর একাধিক ব্যবসায়ী নেতা জানিয়েছেন, এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি গ্যাস সংকটের আর্থিক চাপও বহন করছে শিল্প খাত।
গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতির কারণে পোশাক খাতের কিছু কারখানায় উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কারখানাগুলোকে বারবার উৎপাদন পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কোনো কোনো নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলেও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। অনেক কারখানায় কয়েক ধাপে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়ছে। তবে এসব তথ্য নির্দিষ্ট কারখানার পরিস্থিতির বর্ণনা; পুরো শিল্প খাতের উৎপাদন একই হারে কমেছে—এমন কোনো সামগ্রিক হিসাব নয়।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় উৎপাদনে সমস্যা বা এলএনজি আমদানিতে বাধা তৈরি হলে সরবরাহ ২২৫ থেকে ২৩০ কোটি ঘনফুটেও নেমে আসে।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে কিছু কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন কমলেও কারখানার অনেক স্থায়ী ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে। ফলে কম পণ্যের ওপর সেই ব্যয় ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি প্রতিযোগিতা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতেও কমছে না গ্যাসের চাপসংক্রান্ত ভোগান্তি।
সব মিলিয়ে এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সাময়িকভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চললেও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরতা, সরবরাহ অনিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো অনিশ্চিত। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার ওপরই স্থায়ী সমাধানের পথ নির্ভর করছে।


















